২০২৬ সালের ৩০ এপ্রিল, বৃহস্পতিবার রাতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনের সমাপনী কার্যদিবসে এক তাৎপর্যপূর্ণ বক্তব্য প্রদান করেন সংসদ নেতা ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তাঁর বক্তব্যে উঠে আসে দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর বর্তমান পরিস্থিতি, নিজের ছাত্রজীবনের তিক্ত অভিজ্ঞতা এবং একটি আধুনিক ও বৈশ্বিক মানসম্পন্ন শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলার দৃঢ় প্রত্যয়। বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানের উত্থাপিত শিক্ষাঙ্গন বিষয়ক উদ্বেগের সূত্র ধরে প্রধানমন্ত্রী এই সুদূরপ্রসারী আলোকপাত করেন।
Table of Contents
ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ও অতীতের সংঘাতময় পরিবেশ
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁর বক্তব্যে দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়াশোনাকালীন নিজের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার কথা স্মরণ করেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, বাংলাদেশের বিদ্যমান শিক্ষাব্যবস্থায় পড়াশোনা করার সময় নব্বইয়ের দশকের অস্থির রাজনৈতিক পরিস্থিতি তাঁকে সরাসরি প্রভাবিত করেছিল। স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি বলেন:
“আমিও এই দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পড়েছি। ৯০-এর স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে রাজনৈতিক ডামাডোলের সময় আমি বেশ কয়েকবার শিক্ষাঙ্গনে ঝামেলার মধ্যে পড়েছিলাম। দুই-একবার বেশ সিরিয়াস অবস্থার মধ্যেও পড়ে গিয়েছিলাম।”
ছাত্র রাজনীতি ও জাতীয় রাজনীতির সংঘাতের কারণে সাধারণ শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা কীভাবে বিঘ্নিত হয়, প্রধানমন্ত্রীর এই স্বীকারোক্তি তারই প্রতিফলন। তিনি বোঝাতে চেয়েছেন যে, এই ধরণের অনিরাপদ পরিবেশ শিক্ষার্থীদের মেধা বিকাশে প্রধান অন্তরায়, যা তিনি নিজে ব্যক্তিগতভাবে অনুভব করেছেন।
বিরোধীদলীয় নেতার উদ্বেগের বিপরীতে সরকারি প্রতিশ্রুতি
অধিবেশনে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান দেশের শিক্ষাঙ্গনের বর্তমান পরিবেশ ও শিক্ষার্থীদের সার্বিক নিরাপত্তা নিয়ে সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। এর প্রেক্ষিতে প্রধানমন্ত্রী বলেন যে, দেশের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম যেন একটি স্থিতিশীল, নিরাপদ ও মানসম্মত পরিবেশে জ্ঞানার্জন করতে পারে, তা নিশ্চিত করা তাঁর সরকারের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য।
তিনি স্পষ্ট ভাষায় স্বীকার করেন যে, দেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর বর্তমান কাঠামো এবং শিক্ষার্থীদের যে অবস্থা তা সন্তোষজনক নয়। তিনি বলেন, “আমরা অবশ্যই চাই না, আমাদের শিক্ষা অঙ্গনগুলোর যে অবস্থা এবং শিক্ষার্থীদের যে অবস্থা—সেটি এরকম থাকবে। সেটি অবশ্যই পরিবর্তিত হোক।” এই বক্তব্যের মাধ্যমে তিনি শিক্ষাঙ্গনে আমূল পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তাকে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকার করে নিলেন।
ব্রিটেনের শিক্ষা ব্যবস্থার বৈশ্বিক মানদণ্ড ও আকাঙ্ক্ষা
দীর্ঘ রাজনৈতিক প্রবাস জীবনে ব্রিটেনে অবস্থানের অভিজ্ঞতাত্তো টেনে প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থাকে বিশ্বমানের পর্যায়ে উন্নীত করার আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করেন। বিরোধীদলীয় নেতার এক সন্তানের সেখানে অবস্থানের বিষয়টি উল্লেখ করে তিনি একটি বৈশ্বিক তুলনা তুলে ধরেন।
প্রধানমন্ত্রী তাঁর পর্যবেক্ষণে তিনটি গুরুত্বপূর্ণ দিক চিহ্নিত করেন:
সুশৃঙ্খল পরিবেশ: উন্নত বিশ্বের স্কুলগুলোতে শিশুদের বিকাশের জন্য যে আনন্দময় ও সুশৃঙ্খল পরিবেশ নিশ্চিত করা হয়, তা আমাদের দেশেও প্রয়োজন।
নাগরিক অধিকার ও সমতা: একজন রাজনীতিবিদ হিসেবে তিনি সর্বদা অনুভব করেছেন যে, বাংলাদেশের সাধারণ ঘরের সন্তানরাও যেন উন্নত বিশ্বের মতো আধুনিক ও নিরাপদ শিক্ষা ব্যবস্থার সুযোগ পায়।
মানসিক ও কাঠামোগত সংস্কার: কেবল বড় বড় দালানকোঠা নয়, বরং শিক্ষার্থীদের মানসিক বিকাশ ও সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করাকে উন্নত বিশ্বের শিক্ষা পদ্ধতির মূল চালিকাশক্তি হিসেবে তিনি চিহ্নিত করেন।
ভবিষ্যৎ রূপরেখা: সহিংসতামুক্ত ও আধুনিক শিক্ষাঙ্গন
প্রধানমন্ত্রী তাঁর সমাপনী বক্তব্যে শিক্ষাঙ্গনে দলীয় প্রভাবমুক্ত পরিবেশ এবং শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিতে সরকারের ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি পুনর্ব্যক্ত করেন। তিনি এমন একটি শিক্ষা ব্যবস্থার স্বপ্ন দেখেন যেখানে শিক্ষার্থীরা কোনো ধরনের রাজনৈতিক সহিংসতা বা অনিরাপদ পরিস্থিতির শিকার হবে না।
তিনি জোর দিয়ে বলেন: ১. নিরাপদ ছাত্রাবাস: ছাত্রাবাসগুলোতে সাধারণ শিক্ষার্থীদের হয়রানি বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হবে। ২. গবেষণামুখী শিক্ষা: শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে কেবল সনদ প্রদানের স্থান নয়, বরং জ্ঞান ও গবেষণার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে গড়ে তোলা হবে। ৩. সম্মিলিত প্রচেষ্টা: রাজনৈতিক দলমত নির্বিশেষে সকলকে শিক্ষাঙ্গনের পবিত্রতা বজায় রাখার এবং শিক্ষার পরিবেশ উন্নত করার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী।
