জাটকা নিধন বিরোধী অভিযান: চাঁদপুরে দুই মাসে ২০৯ জেলের কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ড

ইলিশ সম্পদ রক্ষা এবং জাটকা নিধন রোধে চাঁদপুর সংলগ্ন পদ্মা ও মেঘনা নদীর অভয়াশ্রম এলাকায় পরিচালিত দুই মাসব্যাপী বিশেষ অভিযানে ২০৯ জন জেলেকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড প্রদান করা হয়েছে। ২০২৬ সালের ১ মার্চ থেকে ৩০ এপ্রিল পর্যন্ত সরকারের ঘোষিত নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে জাটকা শিকারের দায়ে এসব জেলেকে আটক ও সাজা প্রদান করে জেলা প্রশাসন ও মৎস্য বিভাগ। ২০২৬ সালের ৩০ এপ্রিল, বৃহস্পতিবার রাত সাড়ে ৮টায় চাঁদপুর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ ফখরুল ইসলাম অভিযানের এই চূড়ান্ত পরিসংখ্যান নিশ্চিত করেন।


অভিযানের পরিসংখ্যান ও আইনি পদক্ষেপ

জাতীয় ইলিশ সম্পদ উন্নয়ন ও জাটকা সংরক্ষণ কার্যক্রমের আওতায় চাঁদপুর জেলার মতলব উত্তর উপজেলার ষাটনল থেকে হাইমচর উপজেলার চরভৈরবী পর্যন্ত বিস্তৃত ৭০ কিলোমিটার অভয়াশ্রম এলাকায় এই কঠোর নজরদারি চালানো হয়। প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, গত দুই মাসে জেলা ও উপজেলা টাস্কফোর্স মোট ৬০৯টি বিশেষ অভিযান পরিচালনা করেছে।

আইনি কার্যক্রমের বিবরণে জানা যায়:

  • কারাদণ্ড: সরকারি নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে অভয়াশ্রমে প্রবেশের দায়ে ২০৯ জন জেলেকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।

  • অর্থদণ্ড: আটককৃত জেলেদের কাছ থেকে মোট ৪ লক্ষ ৬৯ হাজার ৯০০ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়।

  • ভ্রাম্যমাণ আদালত: জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটদের তত্ত্বাবধানে মোট ৩৬টি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালিত হয়েছে।

  • মামলা: দুই মাসে জাটকা নিধনের ঘটনায় বিভিন্ন থানায় মোট ২৩৭টি মামলা দায়ের করা হয়েছে।


জব্দকৃত সরঞ্জাম ও নিলাম কার্যক্রম

অভিযান চলাকালীন জাটকা শিকারের কাজে ব্যবহৃত বিপুল পরিমাণ অবৈধ সরঞ্জাম জব্দ করা হয়েছে। মতলব উত্তর, সদর এবং হাইমচর উপজেলায় পরিচালিত এসব অভিযানে জব্দকৃত মালামালের ব্যবস্থাপনায় প্রচলিত আইনি বিধিমালা অনুসরণ করা হয়।

মৎস্য বিভাগের তথ্যানুযায়ী, জব্দকৃত কারেন্ট জাল ও অন্যান্য অবৈধ জালের একটি বিশাল অংশ স্থানীয় প্রশাসনের উপস্থিতিতে জনসম্মুখে আগুনে পুড়িয়ে বিনষ্ট করা হয়েছে। এছাড়া, অভিযানে জব্দ করা জাটকাগুলো স্থানীয় এতিমখানা, মাদ্রাসা ও দুস্থ ব্যক্তিদের মাঝে যথাযথভাবে বিতরণ করা হয়েছে। মতলব উত্তর উপজেলায় জব্দকৃত কিছু নৌকা আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নিলামে তোলা হয়, যেখান থেকে সরকারি কোষাগারে ২৮ হাজার টাকা জমা হয়েছে।


জাতীয় ইলিশ উৎপাদনে এই অভিযানের তাৎপর্য

সরকার প্রতিবছর মার্চ ও এপ্রিল—এই দুই মাস জাটকা সংরক্ষণের লক্ষ্যে অভয়াশ্রম এলাকায় মাছ ধরার ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। চাঁদপুর জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ ফখরুল ইসলাম জানান, ইলিশের সহনশীল উৎপাদন নিশ্চিত করতে দিন ও রাতে নিরবচ্ছিন্নভাবে টাস্কফোর্সের অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে।

তার মতে, চলতি অর্থবছরে জাতীয়ভাবে ইলিশের উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৬ লক্ষ মেট্রিক টন। চাঁদপুরের এই ৭০ কিলোমিটার অভয়াশ্রমে জাটকা নিধন রোধ করা সম্ভব হলে এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করা সহজতর হবে। জাটকাগুলো বড় হওয়ার সুযোগ পেলে আগামী ভরা মৌসুমে জেলেরা আরও বড় আকৃতির ইলিশ ধরতে পারবেন, যা দীর্ঘমেয়াদে উপকূলীয় জেলে সম্প্রদায়ের অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে বিশেষ সহায়ক হবে।


টাস্কফোর্সের সমন্বয় ও সচেতনতা কার্যক্রম

জাটকা রক্ষা কার্যক্রমকে সফল করতে জেলা প্রশাসন, উপজেলা প্রশাসন, নৌ-পুলিশ, কোস্টগার্ড এবং মৎস্য বিভাগের সমন্বয়ে গঠিত টাস্কফোর্স সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে। অভিযানের পাশাপাশি জেলেদের সচেতন করতে বিভিন্ন লিফলেট বিতরণ ও প্রচারণা চালানো হলেও কিছু অসাধু জেলে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে নদীতে নামার চেষ্টা করেছে, যাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

মৎস্য কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, এই দুই মাসের কার্যক্রম কেবল শাস্তিমূলক নয়, বরং এটি ইলিশের বংশবৃদ্ধির একটি প্রাকৃতিক প্রক্রিয়াকে সুরক্ষিত করার একটি রাষ্ট্রীয় উদ্যোগ। যারা এই সময়ে মাছ ধরা থেকে বিরত ছিলেন, সরকার তাদের বিশেষ ভিজিএফ (VGF) কর্মসূচির আওতায় খাদ্য সহায়তা প্রদান করেছে। অভয়াশ্রম এলাকার এই সফল অভিযানের সুফল ইলিশের পরবর্তী আহরণ মৌসুমে সমগ্র দেশবাসী ভোগ করবে বলে আশা করা হচ্ছে। ২০২৬ সালের ৩০ এপ্রিল মধ্যরাত থেকে এই নিষেধাজ্ঞা সমাপ্ত হওয়ার মাধ্যমে জেলেরা পুনরায় পদ্মা ও মেঘনায় আইনসম্মতভাবে মাছ ধরার সুযোগ পাবেন।