২০২৬ সালের ৩০ এপ্রিল, বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে রাষ্ট্রপতির ভাষণের ওপর আনীত ধন্যবাদ প্রস্তাবের সাধারণ আলোচনায় অংশ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য প্রদান করেছেন স্থানীয় সরকার মন্ত্রী ও বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তার বক্তব্যে রাষ্ট্রপতির পদের সাংবিধানিক গুরুত্ব, সংবিধানের ঐতিহাসিক মর্যাদা এবং গত দেড় দশকের রাজনৈতিক পরিস্থিতির প্রেক্ষাপট বিস্তারিতভাবে উঠে এসেছে। তিনি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, রাষ্ট্রপতি কোনো ব্যক্তি নন বরং একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান, যা রক্ষা করা গণতান্ত্রিক ধারাবাহিকতার জন্য অপরিহার্য।
Table of Contents
রাষ্ট্রপতি পদ: সাংবিধানিক স্থিতিশীলতার প্রতীক
সংসদে দেওয়া ভাষণে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাষ্ট্রপতির পদের প্রাতিষ্ঠানিক গুরুত্ব ব্যাখ্যা করে বলেন, “রাষ্ট্রপতি যেই হোন না কেন, তিনি একটি প্রতিষ্ঠান (ইনস্টিটিউশন)। কোনো ব্যক্তি নয়, আমরা আমাদের প্রয়োজনে সেই প্রতিষ্ঠানকেই রক্ষা করেছি।” তিনি উল্লেখ করেন যে, ৫ আগস্টের পরবর্তী ক্রান্তিলগ্নে দেশে যাতে কোনো ধরনের প্রশাসনিক বা সাংবিধানিক শূন্যতা তৈরি না হয়, সে লক্ষ্যেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
তার মতে, ওই বিশেষ মুহূর্তে যদি রাষ্ট্রপতির পদের ধারাবাহিকতা না থাকত, তবে রাষ্ট্রে চরম অরাজকতা ও নৈরাজ্য সৃষ্টি হওয়ার প্রবল আশঙ্কা ছিল। তিনি সাবেক মন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের বক্তব্যের প্রতি সমর্থন জানিয়ে বলেন, জাতীয় প্রয়োজনে এবং রাষ্ট্রের সামগ্রিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করতেই তারা এই প্রতিষ্ঠানটিকে সমুন্নত রেখেছেন। ওই সময়ে দেশ ও জাতিকে রক্ষা করা সম্ভব হতো কি না, তা নিয়েও তিনি সংশয় প্রকাশ করেন।
সংবিধানের মর্যাদা ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
সংবিধান রক্ষার বিষয়ে সরকারের অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে মির্জা ফখরুল বলেন যে, এই সংবিধান বাংলাদেশের অস্তিত্বের সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে আছে। সংবিধানের প্রতি অকুন্ঠ শ্রদ্ধা প্রদর্শন করে তিনি এর তিনটি প্রধান দিক তুলে ধরেন:
ঐতিহাসিক ভিত্তি: এই সংবিধান ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে লক্ষ লক্ষ শহীদের রক্তের বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে। এটি কোনো সাধারণ আইনি নথি নয়, বরং জাতির দীর্ঘ সংগ্রামের ফসল।
অস্তিত্ব ও আবেগ: বাংলাদেশের স্বাধীনতার সার্বভৌমত্বের প্রধান স্তম্ভ হিসেবে এই সংবিধান এদেশের মানুষের আবেগ ও চেতনার সঙ্গে যুক্ত।
গণতান্ত্রিক রক্ষা কবচ: একটি স্বাধীন বাংলাদেশের রূপরেখা হিসেবে এই সংবিধানের মর্যাদা রক্ষা করা বর্তমান প্রজন্মের পবিত্র দায়িত্ব। এর ভিত্তি নড়বড়ে হলে রাষ্ট্রের কাঠামো ভেঙে পড়বে বলে তিনি সতর্ক করেন।
দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের পরিসংখ্যান ও খতিয়ান
বক্তৃতাকালে বিএনপি মহাসচিব বিগত ১৫ বছরের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট এবং গণতান্ত্রিক অধিকার পুনরুদ্ধারের সংগ্রামের চিত্র তুলে ধরেন। তিনি স্পিকারকে সাক্ষী রেখে বলেন যে, দীর্ঘ ১৫ বছর তারা ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে লড়াই করেছেন। এ সময়ে দলের নেতাকর্মীদের ওপর নেমে আসা নির্যাতনের কিছু ভয়াবহ পরিসংখ্যান তিনি তুলে ধরেন:
১. শীর্ষ নেতৃত্বের ওপর চাপ: দীর্ঘ লড়াইয়ের সময় বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া অধিকাংশ সময় কারাগারে অন্তরীণ ছিলেন। অন্যদিকে, দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানকে মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে প্রবাসে নির্বাসিত অবস্থায় থাকতে বাধ্য করা হয়েছে। ২. মামলার বোঝা: গত দেড় দশকে প্রায় ৬০ লক্ষ নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে বিভিন্ন মেয়াদে মিথ্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে বলে তিনি তথ্য প্রদান করেন। ৩. প্রাণহানি ও গুম: এ সময়ে প্রায় ২০ হাজার নেতাকর্মীকে হত্যা করা হয়েছে। এছাড়াও এম ইলিয়াস আলী ও পারভেজ হিরুসহ প্রায় ১৭শ নেতাকর্মীকে গুম বা নিখোঁজ করা হয়েছে বলে তিনি অভিযোগে উল্লেখ করেন। গুম হওয়া পরিবারের শিশুদের মানবিক কষ্টের কথা উল্লেখ করতে গিয়ে তিনি আবেগঘন পরিবেশের অবতারণা করেন।
রাষ্ট্রীয় স্থিতিশীলতা নিশ্চিতকরণে বর্তমান সরকারের অবস্থান
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর তার বক্তব্যে বর্তমান সরকারের মূল লক্ষ্য স্পষ্ট করেছেন। তিনি জানান যে, ৫ আগস্ট পরবর্তী পরিস্থিতিতে দেশ ও জাতিকে সম্ভাব্য অরাজকতা থেকে রক্ষা করাই ছিল তাদের প্রধান অগ্রাধিকার। তিনি পুনরায় জোর দিয়ে বলেন যে, সংবিধান ও রাষ্ট্রপতির পদকে রক্ষা করার মাধ্যমেই একটি গণতান্ত্রিক পরিবেশ ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে।
