দেশের বাজারে মে মাসের জন্য জ্বালানি তেলের দাম অপরিবর্তিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, মে মাসে ডিজেল, পেট্রোল, অকটেন ও কেরোসিন এপ্রিল মাসের নির্ধারিত দরেই বিক্রয় করা হবে। ২০২৬ সালের ৩০ এপ্রিল, বৃহস্পতিবার মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সহকারী সচিব মো. এনামুল হক স্বাক্ষরিত এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে এই মূল্য স্থিতিশীল রাখার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। মূলত আন্তর্জাতিক বাজারের বর্তমান প্রবণতা এবং অভ্যন্তরীণ সরবরাহ পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে।
Table of Contents
মে মাসের নির্ধারিত মূল্য তালিকা
মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, ১ মে ২০২৬ থেকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত ভোক্তা পর্যায়ে জ্বালানি তেলের বিক্রয়মূল্য নিম্নরূপ থাকবে:
ডিজেল: প্রতি লিটার ১১৫ টাকা।
অকটেন: প্রতি লিটার ১৪০ টাকা।
পেট্রোল: প্রতি লিটার ১৩৫ টাকা।
কেরোসিন: প্রতি লিটার ১৩০ টাকা।
উল্লেখ্য যে, এর আগে গত ১৮ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে এক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এই মূল্য কাঠামো নির্ধারণ করা হয়েছিল। বিশ্ববাজারে তেলের মূল্যের সাম্প্রতিক ওঠানামা পর্যবেক্ষণ করে সংশ্লিষ্ট বিভাগ সিদ্ধান্ত নিয়েছে যে, বর্তমান পরিস্থিতিতে অভ্যন্তরীণ বাজারে মূল্য পরিবর্তনের প্রয়োজন নেই। ফলে মে মাসেও এপ্রিলের নির্ধারিত দরেই জ্বালানি সংগ্রহ করতে পারবেন সাধারণ গ্রাহকরা।
স্বয়ংক্রিয় মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি ও প্রেক্ষাপট
বর্তমানে বাংলাদেশে জ্বালানি তেলের মূল্য নির্ধারণে ‘স্বয়ংক্রিয় মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি’ (Automatic Pricing Formula) কার্যকর রয়েছে। এই নিয়ম অনুযায়ী, প্রতি মাসে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দামের হ্রাস-বৃদ্ধির ওপর ভিত্তি করে স্থানীয় বাজারেও দাম সমন্বয় করা হয়। মে মাসের মূল্য পর্যালোচনায় দেখা গেছে যে, আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের (ব্রেন্ট ক্রুড ও ডব্লিউটিআই) মূল্যে যে সামান্য তারতম্য হয়েছে, তা স্থানীয় বাজারের বর্তমান কাঠামোর মধ্যে সমন্বয়যোগ্য।
জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুসারে, আমদানিকৃত তেলের ব্যয় এবং দেশের বর্তমান মজুত পরিস্থিতি সন্তোষজনক পর্যায়ে রয়েছে। এ কারণেই আমদানির এলসি (LC) সেটেলমেন্ট ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক খরচ বিবেচনা করে দাম না বাড়িয়ে পূর্বের অবস্থায় রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এটি মূলত আন্তর্জাতিক বাজারের অস্থিরতা থেকে দেশীয় ভোক্তাদের সুরক্ষা দেওয়ার একটি প্রশাসনিক পদক্ষেপ।
অর্থনৈতিক প্রভাব ও খাতভিত্তিক বিশ্লেষণ
জ্বালানি তেলের দাম অপরিবর্তিত রাখার এই সিদ্ধান্ত দেশের অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে আশা করা হচ্ছে:
১. কৃষি খাত: মে মাস বাংলাদেশে বোরো ধান কাটার প্রধান মৌসুম। দেশের একটি বড় অংশের সেচ পাম্প এবং কৃষি যন্ত্রপাতি ডিজেলের ওপর নির্ভরশীল। ডিজেলের দাম ১১৫ টাকায় স্থিতিশীল থাকায় কৃষকদের উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যয় বাড়বে না, যা খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সহায়ক হবে।
২. পরিবহন খাত: বাস, ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যানের মতো পণ্যবাহী ও গণপরিবহন মূলত ডিজেল চালিত। তেলের দাম না বাড়ার ফলে মে মাসে যাতায়াত ভাড়া এবং পণ্য পরিবহনের খরচে কোনো বাড়তি চাপ পড়বে না। এটি সরাসরি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের বাজারদর স্থিতিশীল রাখতে সহায়তা করবে।
৩. মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ: জ্বালানির দাম বাড়লে সাধারণত তার চেইন রিঅ্যাকশন হিসেবে সব ধরনের সেবার দাম বেড়ে যায়। মে মাসে দাম অপরিবর্তিত থাকায় সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখা সরকারের জন্য সহজতর হবে।
বিপিসি ও মন্ত্রণালয়ের পর্যবেক্ষণ
সরকারের পক্ষে জ্বালানি তেলের আমদানি ও সরবরাহ তদারকি করে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন (বিপিসি)। বিপিসি সূত্রে জানা গেছে, মে মাসে জ্বালানি তেলের চাহিদা ও সরবরাহের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে সব ধরনের প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজার থেকে তেল আমদানির প্রক্রিয়া স্বাভাবিক রয়েছে এবং দেশের সকল ডিপোতে পর্যাপ্ত মজুত নিশ্চিত করা হয়েছে।
মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে আরও জানানো হয়েছে যে, সরকার সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা এবং শিল্প উৎপাদনের ধারাবাহিকতা রক্ষার বিষয়টি সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছে। আন্তর্জাতিক বাজারে বড় ধরনের কোনো অস্বাভাবিক পরিবর্তন না ঘটলে আগামী মাসগুলোতেও এই স্বয়ংক্রিয় পদ্ধতির মাধ্যমে জনবান্ধব মূল্য বজায় রাখার চেষ্টা করা হবে। কেরোসিনের দাম অপরিবর্তিত থাকায় গ্রামীণ জনপদের সাধারণ মানুষ যারা রান্নাবান্না ও আলোকসজ্জার জন্য এর ওপর নির্ভরশীল, তারা বাড়তি আর্থিক ব্যয় থেকে রক্ষা পাবেন।
সার্বিকভাবে, মে মাসের এই প্রজ্ঞাপনটি দেশের কৃষি, শিল্প ও সেবা খাতের ব্যয় স্থিতিশীল রাখার মাধ্যমে জাতীয় অর্থনীতিতে একটি ভারসাম্যপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে মনে করা হচ্ছে। ১ মে থেকে সারা দেশের সকল পেট্রোল পাম্প ও ডিলার পর্যায়ে এই মূল্য তালিকা কার্যকর থাকবে।
