চট্টগ্রাম মহানগরীর সাম্প্রতিক জলাবদ্ধতা নিয়ে গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত সংবাদকে ‘ভিত্তিহীন ও বানোয়াট’ হিসেবে অভিহিত করেছেন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম। ২০২৬ সালের ৩০ এপ্রিল, বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদে ৩০০ বিধিতে দেওয়া এক বিবৃতিতে তিনি এই দাবি করেন। প্রতিমন্ত্রীর মতে, নগরীতে ব্যাপক জলাবদ্ধতা সৃষ্টির কোনো তথ্যগত ভিত্তি নেই; বরং অতিবৃষ্টির কারণে গুটিকতক স্থানে সাময়িক ‘জলজট’ তৈরি হয়েছিল যা দ্রুততম সময়ে নিরসন করা হয়েছে।
Table of Contents
সরেজমিন পরিদর্শন ও তথ্য যাচাই
বিবৃতিতে প্রতিমন্ত্রী জানান, গত ২৯ এপ্রিল জাতীয় সংসদে চট্টগ্রাম মহানগরী পানির নিচে তলিয়ে থাকা সংক্রান্ত আলোচনার পর প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ নির্দেশনায় তিনি সরাসরি চট্টগ্রামে যান। বুধবার থেকে বৃহস্পতিবার দুপুর পর্যন্ত তিনি নগরীর বিভিন্ন এলাকা সরেজমিন পরিদর্শন করেন। মীর শাহে আলম সংসদে বলেন:
“চট্টগ্রাম মহানগর পানির ওপর ভাসছে—এ রকম তথ্য প্রচার সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও কাল্পনিক। মূলত ২০২৪ সালের পুরনো কিছু ছবি ব্যবহার করে একটি গোষ্ঠী অপপ্রচার চালিয়েছে। পরিদর্শনে আমি সাধারণ মানুষের সঙ্গে কথা বলেছি। তারা স্বীকার করেছেন যে, এক বা দুই বছর আগে যে পরিমাণ জলাবদ্ধতা হতো, বর্তমানে তা নেই।”
প্রতিমন্ত্রী আরও উল্লেখ করেন যে, প্রধানমন্ত্রী জনৈক সংসদ সদস্যের বক্তব্য ও খবরের ভিত্তিতে সরল বিশ্বাসে নগরবাসীর কাছে দুঃখ প্রকাশ করেছিলেন। নগরবাসী প্রধানমন্ত্রীর এই উদারতাকে অত্যন্ত ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করেছেন এবং তার প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন।
ঘটনার প্রেক্ষাপট ও সংসদীয় বিতর্ক
গত ২৮ এপ্রিল চট্টগ্রামে ভারী বর্ষণের ফলে নগরীর নিচু এলাকাগুলোতে পানি জমে যায়। এই ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে ২৯ এপ্রিল বুধবার জাতীয় সংসদে ‘পয়েন্ট অব অর্ডারে’ বিষয়টি উত্থাপন করেন বিএনপির সংসদ সদস্য সাঈদ আল নোমান। তিনি দাবি করেন, জলাবদ্ধতার কারণে চট্টগ্রামবাসী চরম ভোগান্তিতে রয়েছেন। তার এই অভিযোগের ভিত্তিতে প্রধানমন্ত্রী তৎক্ষণাৎ দুঃখ প্রকাশ করে সমস্যা সমাধানের আশ্বাস দিয়েছিলেন। স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রীর বর্তমান বিবৃতিটি মূলত সেই অভিযোগের বিপরীতে মাঠপর্যায়ের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরার একটি প্রয়াস।
জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের বর্তমান অবস্থা
চট্টগ্রামের জলাবদ্ধতা নিরসনে সরকারের চলমান মেগা প্রকল্পের কারিগরি ও পরিসংখ্যানগত তথ্য প্রতিমন্ত্রী সংসদে বিস্তারিতভাবে উপস্থাপন করেন। তার দেওয়া তথ্যানুযায়ী:
খাল ও ড্রেনেজ ব্যবস্থা: চট্টগ্রাম নগরীতে সর্বমোট ৫৭টি প্রধান খাল রয়েছে।
মেগা প্রকল্পের বিনিয়োগ: এর মধ্যে ৩৬টি খালের সংস্কার ও উন্নয়ন কাজ ১২ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) মাধ্যমে বাস্তবায়িত হচ্ছে। প্রকল্পের কাজ তদারকি করছে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী।
কাজের অগ্রগতি: ৩৬টি খালের মধ্যে ইতিমধ্যে ৩০টি খালের কাজ সম্পূর্ণভাবে শেষ হয়েছে। অবশিষ্ট ৬টি খালের উন্নয়ন কাজ বর্তমানে চলমান রয়েছে।
প্রতিমন্ত্রী ব্যাখ্যা করেন যে, উন্নয়ন কাজ চলমান থাকার কারণে কিছু খালের ওপর অস্থায়ী বাঁধ বা ‘রিটেইনিং ওয়াল’ নির্মাণ করতে হয়েছিল। গত ২৮ এপ্রিল চট্টগ্রামে হঠাৎ ২২০ মিলিমিটার অতিবৃষ্টি হওয়ায় ওই বাঁধগুলোর কারণে পানিপ্রবাহ সাময়িকভাবে বাধাগ্রস্ত হয়। এর ফলে প্রবর্তক মোড়সহ নগরীর মাত্র পাঁচটি স্থানে জলজট তৈরি হয়েছিল। তবে পলি অপসারণ ও যৌথ ড্রেনেজ কার্যক্রমের মাধ্যমে মাত্র তিন থেকে চার ঘণ্টার মধ্যেই সেই পানি নিষ্কাশন করা সম্ভব হয়েছে।
জলজট বনাম জলাবদ্ধতা: একটি সংজ্ঞাগত বিশ্লেষণ
প্রতিমন্ত্রী তার বক্তব্যে ‘জলাবদ্ধতা’ এবং ‘জলজট’ শব্দ দুটির মধ্যে একটি স্পষ্ট কারিগরি পার্থক্য টেনেছেন। তিনি দাবি করেন, জলাবদ্ধতা বলতে দীর্ঘসময় ধরে বিশাল এলাকা পানির নিচে নিমজ্জিত থাকাকে বোঝায়, যা বর্তমানে চট্টগ্রামে অনুপস্থিত। অন্যদিকে, অতিবৃষ্টির সময় নালা বা খালের সক্ষমতার অতিরিক্ত পানি সাময়িকভাবে জমে থাকাকে তিনি ‘জলজট’ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন। প্রতিমন্ত্রী জোর দিয়ে বলেন যে, বর্তমানে চট্টগ্রামের কোথাও কোনো পানি জমে নেই এবং আজ দুপুর পর্যন্ত শহর সম্পূর্ণ শুষ্ক ছিল।
উন্নয়ন প্রকল্পের সুফল ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
মীর শাহে আলম তার বিবৃতিতে দাবি করেন যে, ১২ হাজার কোটি টাকার প্রকল্পের সুফল নগরবাসী পেতে শুরু করেছেন। গত ২৮ এপ্রিলের অতিবৃষ্টির পরিমাণ (২২০ মিলিমিটার) বিবেচনায় নিলে কয়েক বছর আগে নগরীর অর্ধেকের বেশি এলাকা প্লাবিত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বর্তমান অবকাঠামোগত উন্নতির কারণে তা কেবল ৫টি পয়েন্টে সীমাবদ্ধ ছিল।
তিনি আশা প্রকাশ করেন যে, অবশিষ্ট ৬টি খালের কাজ সমাপ্ত হলে এবং চলমান বাঁধগুলো সরিয়ে নিলে চট্টগ্রাম মহানগরী আগামী মৌসুমে পুরোপুরি জলাবদ্ধতামুক্ত থাকবে। একই সঙ্গে তিনি গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারকারীদের সত্যতা যাচাই না করে পুরনো ছবি বা ভুল তথ্য প্রচার থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান। প্রতিমন্ত্রীর এই বিবৃতির মাধ্যমে সরকার চট্টগ্রামে জলাবদ্ধতা নিরসন প্রকল্পের কার্যকারিতা এবং ভবিষ্যৎ সাফল্যের ব্যাপারে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করল।
