নজরুল সৃষ্টিতে গানের সব রূপের মিলন

বাংলা বছরের প্রথম মাস বৈশাখের তীব্র গরমের মধ্যেও নিজের জীবনযাপন ও কাজের ধারা সুশৃঙ্খলভাবে পরিচালনা করছেন সংগীতশিল্পী ফেরদৌস আরা। তিনি জানান, বর্তমানে তিনি সময়কে নিজের মতো করে ভাগ করে নিয়েছেন, যাতে নীরব ও একান্ত পরিবেশে সংগীতচর্চা এবং ধ্যানের সুযোগ পান। তাঁর মতে, ব্যস্ত জীবনের ভিড়ের মধ্যেও এই ব্যক্তিগত অনুশীলনই মানসিক স্থিরতা বজায় রাখার প্রধান উপায়।

ফেরদৌস আরা বলেন, কর্মব্যস্ততার মধ্যেও নিজের জন্য নির্দিষ্ট সময় রাখা তাঁর দীর্ঘদিনের অভ্যাস। এই সময়েই তিনি সংগীতচর্চা করেন এবং আত্মিক প্রশান্তি খুঁজে পান। তাঁর ভাষায়, বছর পরিবর্তন, উৎসব বা বিভিন্ন আনুষ্ঠানিকতার চেয়ে নিজের সৃজনশীল কাজের ধারাবাহিকতাই তাঁর কাছে বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

গত বছর তিনি রাষ্ট্রীয়ভাবে দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা একুশে পদক লাভ করেন। একই সময়ে তিনি চ্যানেল আই সংগীত পুরস্কারে আজীবন সম্মাননাও অর্জন করেন। তবে এসব স্বীকৃতির চেয়ে তাঁর কাছে শ্রোতাদের ভালোবাসাই সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি বলে তিনি মনে করেন। তিনি জানান, তিনি কোনো প্রতিযোগিতামূলক মানসিকতা নিয়ে কাজ করেন না, বরং মনোযোগ দিয়ে নিজের দায়িত্ব পালন করাই তাঁর মূল লক্ষ্য।

তিনি আরও জানান, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যখন কাজী নজরুল ইসলামের সংগীত নিয়ে অনুষ্ঠান হয়, তখন তাঁকে বিশেষভাবে আমন্ত্রণ জানানো হয়। এই ধরনের সম্মানকে তিনি কোনো বস্তুগত অর্জনের সঙ্গে তুলনা করতে চান না। তাঁর মতে, মানুষের আন্তরিক ভালোবাসা ও গ্রহণযোগ্যতাই সব ধরনের পুরস্কারের চেয়ে বেশি মূল্যবান।

ফেরদৌস আরা দীর্ঘ ২৬ বছর ধরে তাঁর সংগীত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান “সুরসপ্তক” পরিচালনা করে আসছেন। এই প্রতিষ্ঠান থেকে বহু শিক্ষার্থী সংগীতের প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেছে। প্রতি বছর বাংলা বছরের চৈত্র সংক্রান্তি ও পহেলা বৈশাখকে কেন্দ্র করে বিশেষ সাংস্কৃতিক আয়োজন করা হয়। এবারও সেই ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকছে।

আগামী ২ মে রাজধানীর সেগুনবাগিচায় অবস্থিত বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় নাট্যশালার মূল মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হবে “বিদায় বর্ষবরণ” শীর্ষক অনুষ্ঠান। এই আয়োজনে বাংলা ১৪৩২ সালকে বিদায় জানিয়ে ১৪৩৩ সালকে বরণ করা হবে। অনুষ্ঠানে চৈত্র সংক্রান্তি, পহেলা বৈশাখ এবং কাজী নজরুল ইসলামের জন্মজয়ন্তীর বিভিন্ন দিক একত্রে উপস্থাপন করা হবে।

অনুষ্ঠানে সুরসপ্তকের শিক্ষার্থীরা সংগীত পরিবেশন করবে। পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন প্রজন্মের শিল্পীরাও এতে অংশ নেবেন। আয়োজনে বিভিন্ন পর্যায়ের অতিথিদের উপস্থিত থাকার কথাও রয়েছে।

ফেরদৌস আরা মনে করেন, কাজী নজরুল ইসলাম কেবল একটি নির্দিষ্ট ধারার সংগীতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নন; বরং তাঁর সৃষ্টিতে নানা ধরনের সংগীতের বিস্তৃত সমাহার রয়েছে। সেই দৃষ্টিভঙ্গিকে ধারণ করেই সুরসপ্তকের আয়োজনে বিভিন্ন ধারার শিল্পীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা হয়।

তিনি জানান, তাঁর প্রতিষ্ঠানে অভিজ্ঞ ও দক্ষ শিক্ষকরা সংগীত শিক্ষা প্রদান করেন। তাঁদের মধ্যে ধ্রুপদী সংগীতের প্রশিক্ষক, নজরুল সংগীত বিষয়ে অভিজ্ঞ শিক্ষক এবং তরুণ প্রজন্মের দক্ষ শিল্পীরা রয়েছেন। এই সমন্বিত শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের সর্বোচ্চ মানের প্রশিক্ষণ দেওয়ার চেষ্টা করা হয়।

ফেরদৌস আরা শিশু শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কাজ করাকে অত্যন্ত উপভোগ করেন বলেও জানান। তিনি বলেন, নতুন প্রজন্মকে সংগীত শিক্ষা দেওয়া এবং তাদের প্রতিভা বিকাশে সহায়তা করা তাঁর কাছে বিশেষ আনন্দের বিষয়। তাঁর মতে, শিক্ষার্থীদের সাফল্যই একজন শিক্ষকের প্রকৃত অর্জন।

সুরসপ্তক সংগীত শিক্ষাকেন্দ্রের তথ্য

বিষয়বিবরণ
প্রতিষ্ঠানের নামসুরসপ্তক
পরিচালকফেরদৌস আরা
কার্যক্রমের সময়কালপ্রায় ২৬ বছর
প্রধান কার্যক্রমসংগীত শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক প্রশিক্ষণ
বার্ষিক আয়োজনচৈত্র সংক্রান্তি, পহেলা বৈশাখ ও বিশেষ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান
আসন্ন অনুষ্ঠানবিদায় বর্ষবরণ
তারিখ ও স্থান২ মে, বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমি, ঢাকা

ফেরদৌস আরার মতে, সংগীতচর্চা, শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কাজ এবং সাংস্কৃতিক আয়োজন—এই তিনটি ক্ষেত্রই তাঁর জীবনের প্রধান অনুপ্রেরণা এবং চলমান কর্মধারার অংশ।