রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে (রাবি) ছাত্ররাজনীতিকে কেন্দ্র করে আবারও উত্তেজনাকর পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। সম্প্রতি ক্যাম্পাসের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি সংলগ্ন দেয়ালে ‘গুপ্ত রাজনীতি নিষিদ্ধ চাই’— এমন স্লোগান লিখনের সামনে দাঁড়িয়ে ফটোসেশন করেছেন বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রশিবিরের নেতাকর্মীরা। এই ঘটনাকে ঘিরে ক্যাম্পাসজুড়ে নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্ক, পাল্টাপাল্টি বক্তব্য এবং আলোচনা শুরু হয়েছে।
বুধবার (২২ এপ্রিল) বিকেল আনুমানিক ৫টার দিকে ছাত্রশিবিরের একটি দল ওই দেয়াল লিখনের সামনে গিয়ে অবস্থান নেয় এবং সেখানে ছবি তোলে। জানা গেছে, কিছুদিন আগেই ছাত্রদল এই দেয়াল লিখন কর্মসূচি পালন করে, যেখানে ক্যাম্পাসে ‘গুপ্ত রাজনীতি নিষিদ্ধ’ করার দাবি তোলা হয়। ফলে একই স্থানে ভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠনের উপস্থিতি ও প্রতীকী অবস্থান ক্যাম্পাসে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, শিবির নেতাকর্মীরা কোনো ধরনের স্লোগান বা উত্তেজনাকর পরিস্থিতি সৃষ্টি না করেই স্বাভাবিকভাবে সেখানে উপস্থিত হয়ে কিছু সময় অবস্থান করেন এবং ছবি তোলেন। তবে ঘটনাটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই এটি নিয়ে ব্যাপক আলোচনা শুরু হয় এবং শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিভক্ত মতামত দেখা যায়।
Table of Contents
ছাত্রশিবিরের ব্যাখ্যা ও অবস্থান
রাবি ছাত্রশিবিরের সভাপতি মুজাহিদ ফয়সাল দাবি করেন, তারা মূলত ওই এলাকায় চা পান করতে যাওয়ার পথে দেয়াল লিখনটি দেখতে পান। তিনি বলেন, “ছাত্রদল ভাইয়েরা পরিশ্রম করে দেয়াল লিখন করেছে, সেটার সামনে দাঁড়িয়ে আমরা শুধু ছবি তুলেছি। আমরা তাদের মূল দাবির সঙ্গে একমত যে গুপ্ত রাজনীতির কোনো সুযোগ নেই।”
তিনি আরও মন্তব্য করেন, যারা সংকটের সময় দেশ ত্যাগ করে, জনগণ তাদের রাজনৈতিক নেতৃত্ব মেনে নেয় না— এমন ইঙ্গিত দিয়ে সংগঠনের রাজনৈতিক অবস্থান তুলে ধরেন।
অন্যদিকে, রাবি ছাত্রশিবিরের দাওয়াহ সম্পাদক ও মতিহার হল সংসদের ভিপি তাজুল ইসলাম বলেন, ছাত্রশিবিরকে ‘গুপ্ত সংগঠন’ বলা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। তার দাবি অনুযায়ী, সংগঠনটি দীর্ঘদিন ধরে প্রকাশ্য কার্যক্রম চালিয়ে আসছে, যার মধ্যে রয়েছে ক্যারিয়ার গাইডলাইন, প্রকাশনা উৎসব, ফ্রি মেডিকেল ক্যাম্প, গোলটেবিল বৈঠক ও সাংস্কৃতিক আয়োজন।
তিনি আরও বলেন, “আমাদের নেতাকর্মীরা রাকসু ও হল সংসদে নির্বাচিত হয়েছে। আমরা প্রকাশ্য রাজনীতি করি। তাহলে আমাদের কেন গুপ্ত বলা হবে?”
ছাত্রদলের পূর্ববর্তী কর্মসূচি
এই ঘটনার আগে ছাত্রদল ক্যাম্পাসে ধারাবাহিক কর্মসূচি পালন করে। চট্টগ্রাম সিটি কলেজে সংঘর্ষের ঘটনার প্রতিবাদে মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল) রাত ৯টায় রাবির পরিবহন চত্বরে বিক্ষোভ মিছিল করে সংগঠনটি। এরপর বুধবার সকালে তারা ক্যাম্পাসে দেয়াল লিখন কর্মসূচি পালন করে, যেখানে জামায়াত-শিবিরের রাজনীতিকে ‘গুপ্ত’ আখ্যা দিয়ে নিষিদ্ধ করার দাবি জানানো হয়।
রাবি ছাত্রদলের সভাপতি সুলতান আহমেদ রাহী বলেন, ক্যাম্পাসে গোপন রাজনৈতিক কার্যক্রম বন্ধে তারা এই কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। তার মতে, বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বচ্ছ, নিয়মতান্ত্রিক ও শিক্ষার্থীবান্ধব রাজনীতি নিশ্চিত করা জরুরি।
ক্যাম্পাসে রাজনৈতিক উত্তেজনার প্রেক্ষাপট
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্ররাজনীতি নতুন কিছু নয়। দীর্ঘদিন ধরেই এখানে বিভিন্ন ছাত্রসংগঠনের মধ্যে আদর্শিক ও রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব বিদ্যমান। বিশেষ করে ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের মধ্যে প্রতীকী কর্মসূচি, পাল্টাপাল্টি অবস্থান এবং কখনও কখনও সংঘর্ষের ইতিহাস রয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে বারবার বলা হয়েছে যে, ক্যাম্পাসে শান্তিপূর্ণ রাজনৈতিক সহাবস্থান নিশ্চিত করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ। দেয়াল লিখন, মিছিল, পাল্টা কর্মসূচি এবং প্রতীকী অবস্থান প্রায়ই শিক্ষার পরিবেশকে প্রভাবিত করে।
সাম্প্রতিক ঘটনার সারসংক্ষেপ
| বিষয় | তথ্য |
|---|---|
| ঘটনার স্থান | কেন্দ্রীয় লাইব্রেরি সংলগ্ন দেয়াল, রাবি |
| ঘটনার সময় | ২২ এপ্রিল, বিকেল ৫টা |
| সংশ্লিষ্ট সংগঠন | ছাত্রশিবির ও ছাত্রদল |
| মূল ইস্যু | ‘গুপ্ত রাজনীতি নিষিদ্ধ চাই’ দেয়াল লিখন |
| ছাত্রশিবিরের অবস্থান | অভিযোগ অস্বীকার, প্রকাশ্য রাজনীতির দাবি |
| ছাত্রদলের অবস্থান | গুপ্ত রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবি |
| পূর্ববর্তী ঘটনা | চট্টগ্রাম সিটি কলেজ সংঘর্ষ প্রতিবাদ কর্মসূচি |
সামগ্রিক বিশ্লেষণ ও পরিস্থিতি
বর্তমান ঘটনাটি শুধু একটি দেয়াল লিখন বা ফটোসেশনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও, এর রাজনৈতিক তাৎপর্য ক্যাম্পাসে বড় ধরনের আলোচনার জন্ম দিয়েছে। শিক্ষার্থীদের একাংশ মনে করছে, বিশ্ববিদ্যালয় পরিবেশে প্রতীকী রাজনৈতিক অবস্থান শিক্ষার স্বাভাবিক পরিবেশে চাপ সৃষ্টি করতে পারে। অন্যদিকে রাজনৈতিক সংগঠনগুলো নিজেদের অবস্থান তুলে ধরতে এ ধরনের কর্মসূচিকে গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে দেখছে।
বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের নজরদারিতে পরিস্থিতি আপাতত নিয়ন্ত্রণে থাকলেও, ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের পাল্টাপাল্টি অবস্থান ভবিষ্যতে আরও উত্তেজনা সৃষ্টি করতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। ক্যাম্পাসে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান নিশ্চিত করতে উভয় পক্ষের সংযমী ভূমিকা এখন সময়ের দাবি হয়ে উঠেছে।
