টিকটকারদের জন্য পাবনা মানসিক হাসপাতালের রোগীরা অতিষ্ঠ

দেশের একমাত্র বিশেষায়িত পাবনা মানসিক হাসপাতালে নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও রোগীদের গোপনীয়তা নিয়ে গুরুতর উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। অভিযোগ উঠেছে, হাসপাতালের ভেতরে ‘রোগী দেখার’ অজুহাতে সাধারণ মানুষ অবাধে প্রবেশ করছে। পাশাপাশি কিছু কথিত কনটেন্ট ক্রিয়েটর রোগীদের ভিডিও ধারণ করে তা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দিচ্ছে, যা নিয়ে নৈতিকতা ও মানবাধিকারের প্রশ্ন উঠেছে।

স্থানীয় সূত্র ও অনুসন্ধানে জানা যায়, কিছু ব্যক্তি ও অননুমোদিত কনটেন্ট নির্মাতা পরিচয়ধারী গোষ্ঠী নিয়মিতভাবে হাসপাতালের ভেতরে প্রবেশ করছে। তারা মানসিক রোগীদের উদ্দেশ্য করে ভিডিও ধারণ করে, যেখানে রোগীদের আচরণকে বিকৃতভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব ভিডিও পরে বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে দেওয়া হয়, যা রোগীদের ব্যক্তিগত মর্যাদা ও গোপনীয়তা মারাত্মকভাবে লঙ্ঘন করছে।

অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে, হাসপাতালের প্রবেশপথে দায়িত্বে থাকা কিছু আনসার সদস্যের বিরুদ্ধে অর্থের বিনিময়ে অননুমোদিত প্রবেশের সুযোগ দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শীদের দাবি অনুযায়ী, জনপ্রতি প্রায় ৫০ টাকা ঘুষ নিয়ে ভেতরে প্রবেশ করানো হয়। এভাবে একটি অনিয়মিত চক্র সক্রিয় রয়েছে, যারা পুরো প্রবেশ প্রক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ।

অনিয়ম ও নিরাপত্তা পরিস্থিতির সংক্ষিপ্ত চিত্র

বিষয়বিস্তারিত অবস্থা
অনুপ্রবেশের ধরনরোগী দেখার অজুহাতে অবাধ প্রবেশ
ভিডিও কার্যক্রমরোগীদের নিয়ে কনটেন্ট তৈরি ও অনলাইনে প্রচার
নিরাপত্তা লঙ্ঘনঘুষের মাধ্যমে প্রবেশের অভিযোগ
ঘুষের পরিমাণজনপ্রতি প্রায় ৫০ টাকা
সংশ্লিষ্ট পক্ষকিছু আনসার সদস্য ও অননুমোদিত দর্শনার্থী
প্রশাসনিক ব্যবস্থাকিছু সদস্যকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি

হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের মতে, এ ধরনের কর্মকাণ্ড রোগীদের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। মানসিক রোগীরা সাধারণত সংবেদনশীল অবস্থায় থাকেন এবং তাদের অতীতের ট্রমা বা মানসিক আঘাত সহজেই পুনরায় জাগ্রত হতে পারে। ফলে অননুমোদিত ভিডিও ধারণ তাদের চিকিৎসা ও সুস্থতার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

হাসপাতালের মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. এ কে এম শফিউল আজম বলেন, এ ধরনের কর্মকাণ্ড রোগীদের মানসিক অবস্থার ওপর গভীর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। তার ভাষায়, “রোগীদের ব্যক্তিগত কষ্ট বা দুর্বল মুহূর্তকে ক্যামেরায় ধারণ করে প্রকাশ করা তাদের পুনরুদ্ধার প্রক্রিয়াকে ব্যাহত করে। এতে তাদের মানসিক আঘাত আরও গভীর হতে পারে।”

অন্যদিকে হাসপাতালের পরিচালক শাফকাত ওয়াহিদ জানান, বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। তিনি বলেন, হাসপাতালের ভেতরে অনুপ্রবেশ রোধে ইতোমধ্যে কঠোর নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে এবং অনিয়মে জড়িত থাকার অভিযোগে দুইজন আনসার সদস্যকে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে এই ধরনের অনিয়ম চললেও কার্যকর নজরদারি ছিল না। এর ফলে একটি চক্র সুযোগ নিয়ে রোগীদের গোপনীয়তা ও মর্যাদাকে হুমকির মুখে ফেলছে। তাদের মতে, হাসপাতালটি যেহেতু দেশের একমাত্র বিশেষায়িত মানসিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র, তাই এখানে নিরাপত্তা ও নৈতিকতার মান আরও কঠোর হওয়া উচিত।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মানসিক স্বাস্থ্যসেবার মূল ভিত্তি হলো রোগীর গোপনীয়তা, সম্মান এবং নিরাপদ পরিবেশ। কিন্তু অননুমোদিত ভিডিও ধারণ ও অবাধ প্রবেশ সেই ভিত্তিকে দুর্বল করে দিচ্ছে। এতে রোগীদের চিকিৎসা কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি সামাজিকভাবে তাদের পুনর্বাসনও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

বর্তমানে বিষয়টি নিয়ে প্রশাসনিক তদন্তের দাবি জোরালো হয়েছে। স্থানীয়রা দ্রুত নিরাপত্তা ব্যবস্থা পুনর্গঠন, অনুপ্রবেশ সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করা এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানিয়েছেন, যাতে ভবিষ্যতে এ ধরনের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা আর না ঘটে।