ভর্তির শুরুতে মানবিক বিভাগে অধ্যয়ন করার পরও পরীক্ষার মাত্র একদিন আগে জানতে পারে বিভাগ বাণিজ্য

কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলায় এসএসসি পরীক্ষাকে ঘিরে এক শিক্ষার্থীর জীবনে নেমে এসেছে অনাকাঙ্ক্ষিত সংকট। মোছা. জারিন তাসনিন সন্ধি নামের ওই পরীক্ষার্থী টানা দুই বছর মানবিক বিভাগে অধ্যয়ন করার পর পরীক্ষার ঠিক আগমুহূর্তে জানতে পারেন, সরকারি নথিতে তিনি বাণিজ্য বিভাগের শিক্ষার্থী হিসেবে নিবন্ধিত। ফলে পরীক্ষা শুরুর প্রাক্কালে তার শিক্ষাজীবন এখন চরম অনিশ্চয়তার মুখে।

রোববার (১৯ এপ্রিল) দুপুরে বিদ্যালয় থেকে প্রবেশপত্র গ্রহণের সময় বিষয়টি প্রকাশ পায়। প্রবেশপত্রে নিজের নামের পাশে ‘ব্যবসায় শিক্ষা’ বিভাগ দেখে হতবাক হয়ে পড়েন সন্ধি। উত্তর চাঁদপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের হয়ে চলতি বছরের এসএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণের কথা থাকলেও বিভাগগত এই অসামঞ্জস্য তাকে গভীর মানসিক চাপে ফেলেছে।

পরিবারের তথ্য অনুযায়ী, সন্ধি জোতমোড়া নিম্ন মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয় থেকে অষ্টম শ্রেণি উত্তীর্ণ হয়ে নবম শ্রেণিতে ভর্তি হন। শুরুতে অল্প সময়ের জন্য বাণিজ্য বিভাগে পড়াশোনা করলেও পরবর্তীতে পারিবারিক কারণে বিভাগ পরিবর্তন করে মানবিকে চলে যান। এরপর নবম ও দশম শ্রেণি জুড়ে তিনি মানবিক বিভাগেই নিয়মিত অধ্যয়ন চালিয়ে যান এবং দশম শ্রেণির বার্ষিক পরীক্ষায় ৮০৭ নম্বর পেয়ে বিভাগে প্রথম স্থান অর্জন করেন।

কিন্তু প্রবেশপত্র হাতে পাওয়ার পর তার সামনে নতুন বাস্তবতা এসে দাঁড়ায়। সরেজমিনে দেখা যায়, তার পড়ার টেবিলে মানবিক বিভাগের বইপত্রই সাজানো—যা তার প্রস্তুতির প্রতিফলন। সন্ধি বলেন, “পরীক্ষা শুরু হতে আর একদিন বাকি। এতদিন মানবিকে পড়েছি, ভালো ফল করেছি। এখন হঠাৎ বাণিজ্য বিভাগের পরীক্ষায় বসা আমার পক্ষে সম্ভব না।”

তার অভিযোগ, বিভাগ পরিবর্তনের বিষয়টি শিক্ষকদের অবহিত করা হলেও তা আনুষ্ঠানিক নথিতে সংশোধন করা হয়নি। ফলে রেজিস্ট্রেশন সংক্রান্ত তথ্য পূর্বের মতোই থেকে গেছে, যার প্রতিফলন ঘটেছে প্রবেশপত্রে।

এ বিষয়ে উত্তর চাঁদপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ আলী বলেন, “রেজিস্ট্রেশন যে বিভাগে হয়েছে, প্রবেশপত্রও সেই অনুযায়ী এসেছে। শিক্ষার্থী যদি অন্য বিভাগে পড়াশোনা করে থাকে, সেটির দায় বিদ্যালয়ের ওপর বর্তায় না।” তবে তিনি বিষয়টি সমাধানে শিক্ষা বোর্ডের সঙ্গে যোগাযোগের আশ্বাস দিয়েছেন।

অন্যদিকে, জোতমোড়া নিম্ন মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আব্দুর রাজ্জাক জানান, শিক্ষার্থী শুরুতে বাণিজ্য বিভাগে ভর্তি হয়েছিল এবং সেই অনুযায়ী রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন হয়। বর্তমানে বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের চেষ্টা চলছে।

উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা নাজমুল হক বলেন, বিষয়টি তার কাছে বিলম্বে এসেছে। তবে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে সমন্বয় করে দ্রুত সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।

নিম্নে ঘটনাটির গুরুত্বপূর্ণ তথ্যসমূহ উপস্থাপন করা হলো—

বিষয়তথ্য
শিক্ষার্থীর নামমোছা. জারিন তাসনিন সন্ধি
শিক্ষা প্রতিষ্ঠানউত্তর চাঁদপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়
অধ্যয়ন বিভাগমানবিক
নিবন্ধন বিভাগবাণিজ্য
পরীক্ষার তারিখ২১ এপ্রিল
সমস্যা শনাক্তপ্রবেশপত্র বিতরণের দিন
বার্ষিক পরীক্ষার ফলাফল৮০৭ নম্বর, বিভাগে প্রথম

সন্ধির ব্যক্তিগত জীবনও এ পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। জানা গেছে, তিনি এতিম—বাবা-মা দুজনকেই হারিয়েছেন। তার একাডেমিক ভবিষ্যৎ এখন পুরোপুরি নির্ভর করছে প্রশাসনিক জটিলতার দ্রুত ও কার্যকর সমাধানের ওপর। পরিবারটির আশঙ্কা, নির্ধারিত বিভাগে প্রবেশপত্র সংশোধন না হলে তার পক্ষে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করা সম্ভব হবে না।

শিক্ষাবিদদের মতে, এ ধরনের প্রশাসনিক ত্রুটি শিক্ষা ব্যবস্থার তদারকি ও জবাবদিহিতার ঘাটতিরই প্রতিফলন। সময়মতো যথাযথ ব্যবস্থা না নিলে একটি মেধাবী শিক্ষার্থীর গুরুত্বপূর্ণ একটি বছর নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে, যা কোনোভাবেই কাম্য নয়।