নরসিংদীতে শিশু ধর্ষণ: অভিযুক্ত বৃদ্ধ আটক

নরসিংদী প্রতিনিধি: নরসিংদীর মাধবদী এলাকায় সাত বছর বয়সী এক কোমলমতি শিশুকে পাশবিক নির্যাতনের অভিযোগে আবুল কালাম আজাদ (৫৭) নামে এক বৃদ্ধকে আটক করেছে পুলিশ। গত ১৯ এপ্রিল ২০২৬, রবিবার দুপুরে মাধবদী থানাধীন মহিষাসুরা ইউনিয়নের বালুসাইর উত্তরপাড়া গ্রামে এই ন্যাক্কারজনক ঘটনাটি ঘটে। অভিযুক্ত ব্যক্তি ওই এলাকারই স্থায়ী বাসিন্দা এবং স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী হিসেবে পরিচিত।

ঘটনার বিস্তারিত পটভূমি

স্থানীয় সূত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা অনুযায়ী, ভুক্তভোগী শিশুটি বালুসাইর উত্তরপাড়া এলাকার একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রথম শ্রেণির ছাত্রী। ঘটনার দিন দুপুরে স্কুল ছুটির পর সে একাই পায়ে হেঁটে বাড়ির দিকে ফিরছিল। পথিমধ্যে ওত পেতে থাকা প্রতিবেশী আবুল কালাম আজাদ শিশুটিকে একা পেয়ে বিভিন্ন প্রলোভন ও কৌশলে ফুসলিয়ে তার নির্জন বাড়িতে নিয়ে যান। সেখানে শিশুটির ওপর পৈশাচিক যৌন নিপিড়ন চালানো হয় বলে অভিযোগ ওঠে।

পৈশাচিক এই কর্মকাণ্ডের পর শিশুটি যাতে বিষয়টি কাউকে না জানায়, সেজন্য অভিযুক্ত আজাদ তাকে একটি আইসক্রিম কিনে দিয়ে ভয়ভীতি প্রদর্শন করে দ্রুত বাড়ি পাঠিয়ে দেন। বাড়িতে ফেরার পর শিশুটির অস্বাভাবিক আচরণ এবং শারীরিক যন্ত্রণায় কান্নাকাটি দেখে মা-বাবার মনে সন্দেহের সৃষ্টি হয়। একপর্যায়ে পরিবারের সদস্যদের আশ্বাসের ভিত্তিতে শিশুটি তার সাথে ঘটে যাওয়া বীভৎস ঘটনার বিস্তারিত বর্ণনা দেয়।

জনরোষ ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা

সন্তানের ওপর এমন নির্মম নির্যাতনের কথা শুনে অভিভাবকরা কান্নায় ভেঙে পড়েন এবং খবরটি দ্রুত গ্রামে ছড়িয়ে পড়ে। মুহূর্তের মধ্যে স্থানীয় বাসিন্দারা ক্ষোভে ফেটে পড়েন এবং অভিযুক্ত আজাদের বাড়ি ঘেরাও করেন। উত্তেজিত জনতা তাকে ধরে গণধোলাই দেওয়ার চেষ্টা করলে এলাকায় চরম উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। খবর পেয়ে মাধবদী থানা পুলিশের একটি বিশাল দল দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনার চেষ্টা করে।

পুলিশ সদস্যরা বিক্ষুব্ধ জনতার হাত থেকে অভিযুক্তকে উদ্ধার করে নিজেদের হেফাজতে নিয়ে থানায় নিয়ে আসেন। এই সময় উত্তেজিত জনতা অভিযুক্তের বসতবাড়িতে হামলা চালিয়ে আসবাবপত্র ভাঙচুর করে। তবে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েনের মাধ্যমে পরিস্থিতি স্বাভাবিক করা হয় এবং স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের সহযোগিতায় জনতাকে শান্ত করা হয়।

ভুক্তভোগীর চিকিৎসাগত ও আইনি অবস্থা

ঘটনার পরপরই পুলিশ ও পরিবারের সহযোগিতায় শিশুটিকে উদ্ধার করে নরসিংদী সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়। বর্তমানে সে হাসপাতালের ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টারে (ওসিসি) বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের তত্ত্বাবধানে চিকিৎসাধীন রয়েছে। হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, শিশুটি শারীরিকভাবে অত্যন্ত নাজুক অবস্থায় রয়েছে এবং মানসিকভাবে প্রচণ্ড আতঙ্কগ্রস্ত (Post-Traumatic Stress)। তার প্রয়োজনীয় ফরেনসিক পরীক্ষা সম্পন্ন করার প্রক্রিয়া চলছে।

মাধবদী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কামাল হোসেন গণমাধ্যমকে জানান, অভিযুক্ত আবুল কালাম আজাদ বর্তমানে থানা হাজতে রয়েছেন। শিশুটির বাবা বাদী হয়ে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে একটি মামলা দায়ের করেছেন। ওসি আরও যোগ করেন, “আমরা মামলাটিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছি। আলামত সংগ্রহ করা হয়েছে এবং আইন অনুযায়ী দ্রুততম সময়ের মধ্যে চার্জশিট দাখিল করা হবে।”


ঘটনার সারসংক্ষেপ সারণি

বিষয়ের বিবরণবিস্তারিত তথ্য
ঘটনার স্থানবালুসাইর উত্তরপাড়া গ্রাম, মহিষাসুরা ইউনিয়ন, মাধবদী, নরসিংদী।
ঘটনার সময়কাল১৯ এপ্রিল ২০২৬, রবিবার; দুপুর আনুমানিক ১টা ৩০ মিনিট।
অভিযুক্তের পরিচয়আবুল কালাম আজাদ (৫৭), পিতা- অজ্ঞাত।
ভুক্তভোগীর পরিচয়স্থানীয় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রথম শ্রেণির শিক্ষার্থী (৭ বছর)।
বর্তমান আইনি অবস্থাঅভিযুক্ত পুলিশ হেফাজতে, মামলা দায়ের সম্পন্ন।
চিকিৎসাগত অবস্থানরসিংদী সদর হাসপাতালে ওসিসি সেন্টারে চিকিৎসাধীন।
তদন্তের অগ্রগতিআলামত সংগ্রহ ও ফরেনসিক পরীক্ষার প্রক্রিয়া চলমান।

সামাজিক প্রতিক্রিয়া ও বিশেষজ্ঞদের অভিমত

এই পৈশাচিক ঘটনাটি পুরো নরসিংদী জেলা জুড়ে নিন্দার ঝড় তুলেছে। স্থানীয় মানবাধিকার কর্মী ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা এ ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে অপরাধীর সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি তুলেছেন। সমাজবিজ্ঞানীদের মতে, বিচারহীনতার সংস্কৃতি এবং নৈতিক অবক্ষয়ের কারণেই সমাজে শিশুদের ওপর এমন সহিংসতা বাড়ছে।

বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিয়েছেন যে, শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রতিটি এলাকায় পাড়া-মহল্লায় নজরদারি বাড়ানো এবং অভিভাবকদের সচেতন হওয়া জরুরি। একইসাথে, এই ধরণের মামলার বিচারিক প্রক্রিয়া দ্রুত নিষ্পত্তি করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা গেলে ভবিষ্যতে অপরাধীরা এমন সাহস পাবে না। নরসিংদী জেলা পুলিশ প্রশাসন সাধারণ মানুষকে আশ্বস্ত করে জানিয়েছে যে, ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে তারা বদ্ধপরিকর। বর্তমানে ওই এলাকায় থমথমে পরিস্থিতি বিরাজ করলেও নিরাপত্তা নিশ্চিতে পুলিশি টহল জোরদার রাখা হয়েছে।