কুমিল্লা জেলায় হামের (মিজেলস) উপসর্গ ও সংক্রমণ পরিস্থিতি নতুন করে উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত ২৪ ঘণ্টায় জেলায় ৫০ জন নতুন সন্দেহজনক হাম রোগী শনাক্ত হয়েছে। একই সময়ে হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। পরিস্থিতির অবনতি রোধে স্বাস্থ্য বিভাগ ও স্থানীয় প্রশাসন বাড়তি সতর্কতা গ্রহণ করেছে।
রবিবার (১৮ এপ্রিল) সন্ধ্যায় বিষয়টি নিশ্চিত করেন কুমিল্লা জেলার ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা. রেজা সারোয়ার আকবর। তিনি জানান, সাম্প্রতিক সময়ে হামের মতো উপসর্গ নিয়ে রোগীর সংখ্যা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। তবে একই সঙ্গে চিকিৎসা সেবা ও পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে অনেক রোগী সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরছেন বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
জেলা স্বাস্থ্য বিভাগের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, একদিনে নতুন করে ৫০ জনকে সন্দেহজনক হাম রোগী হিসেবে শনাক্ত করা হয়েছে। এদের মধ্যে ১৫ জনকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে এবং ২২ জন চিকিৎসা শেষে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। বর্তমানে নতুন ও পুরোনো মিলিয়ে আরও বেশ কিছু রোগী চিকিৎসাধীন রয়েছেন।
স্বাস্থ্য বিভাগের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৬ সালের শুরু থেকে এখন পর্যন্ত কুমিল্লা জেলায় মোট ৭৫৭ জন সন্দেহজনক হাম রোগী শনাক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে পরীক্ষাগারে ২৮ জনের শরীরে হাম সংক্রমণ নিশ্চিত হয়েছে। একই সময়ে উপসর্গ নিয়ে মোট ৫ জনের মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে বলে স্বাস্থ্য বিভাগ নিশ্চিত করেছে। পাশাপাশি ৪২১ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিলেন, যাদের মধ্যে ৩১০ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন এবং ১১১ জন এখনও চিকিৎসাধীন অবস্থায় আছেন।
সর্বশেষ মৃত্যুর ঘটনায় ১০ মাস বয়সী শিশু মো. হোসাইনকে নিয়ে শোকের ছায়া নেমে এসেছে মুরাদনগর উপজেলার পরিবারে। পরিবারের সদস্যদের তথ্য অনুযায়ী, শিশুটির শরীরে জ্বর, র্যাশ ও শারীরিক দুর্বলতার লক্ষণ দেখা দিলে গত ১৪ এপ্রিল তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। অবস্থার অবনতি হলে তাকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয় এবং ১৭ এপ্রিল রাতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
হাম একটি অত্যন্ত সংক্রামক ভাইরাসজনিত রোগ, যা প্রধানত শিশুদের মধ্যে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। চিকিৎসা বিশেষজ্ঞদের মতে, সময়মতো টিকা গ্রহণ না করা এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল থাকলে এ রোগ মহামারি আকার ধারণ করতে পারে। বিশেষ করে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় এর বিস্তার দ্রুত ঘটে।
স্বাস্থ্য বিভাগের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আক্রান্ত এলাকাগুলোতে নজরদারি জোরদার করা হয়েছে এবং টিকাদান কর্মসূচি আরও সক্রিয়ভাবে পরিচালনা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে অভিভাবকদের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে যাতে তারা তাদের শিশুদের নিয়মিত টিকা গ্রহণ নিশ্চিত করেন এবং উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে টিকাদান কর্মসূচি আরও বিস্তৃত করা, দ্রুত রোগ শনাক্তকরণ ব্যবস্থা জোরদার করা এবং ব্যাপক জনসচেতনতা বৃদ্ধি করা অত্যন্ত জরুরি। বিশেষ করে গ্রামীণ ও ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলে নিয়মিত স্বাস্থ্য নজরদারি না বাড়ালে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।
নিম্নে কুমিল্লায় হামের বর্তমান পরিস্থিতির একটি সারসংক্ষেপ দেওয়া হলো:
| বিষয় | তথ্য |
|---|---|
| নতুন সন্দেহজনক রোগী | ৫০ জন (২৪ ঘণ্টায়) |
| হাসপাতালে ভর্তি | ১৫ জন |
| সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে | ২২ জন |
| মোট সন্দেহজনক রোগী (২০২৬) | ৭৫৭ জন |
| ল্যাবে নিশ্চিত রোগী | ২৮ জন |
| মোট মৃত্যু | ৫ জন |
| বর্তমান চিকিৎসাধীন | ১১১ জন |
| সর্বশেষ নিহত শিশু | মো. হোসাইন (১০ মাস) |
এই পরিস্থিতিতে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন, যাতে সংক্রমণ আরও ছড়িয়ে পড়ার আগেই কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণে আনা যায় এবং শিশু মৃত্যুর হার কমানো সম্ভব হয়।
