গাইবান্ধা জেলার পলাশবাড়ী উপজেলায় এক পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থীকে পাশবিক নির্যাতনের ঘটনায় এলাকায় গভীর শোক ও তীব্র উত্তেজনার সৃষ্টি হয়েছে। উপজেলার বরিশাল ইউনিয়নের ভবানীপুর গ্রামে সংঘটিত এই বর্বরোচিত ঘটনার শিকার শিশুটি বর্তমানে গাইবান্ধা জেনারেল হাসপাতালে যন্ত্রণাকাতর অবস্থায় চিকিৎসাধীন। এই ন্যাক্কারজনক অপরাধের ঘটনায় অভিযুক্ত রিফাত (১৯) নামক এক যুবকের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হলেও সে বর্তমানে পলাতক রয়েছে।
Table of Contents
ঘটনার প্রেক্ষাপট ও লোমহর্ষক বর্ণনা
গত ৪ এপ্রিল (শনিবার) সন্ধ্যার দিকে ভবানীপুর গ্রামে এই মর্মান্তিক ঘটনাটি ঘটে। পারিবারিক ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ভুক্তভোগী শিশুটি প্রতিদিনের ন্যায় পার্শ্ববর্তী একটি বাড়িতে গাভীর দুধ আনতে গিয়েছিল। কাজ শেষে বাড়ি ফেরার পথে নির্জন রাস্তার ধারে ওত পেতে ছিল অভিযুক্ত রিফাত। শিশুটি নির্জন স্থানটি অতিক্রম করার সময় রিফাত তার মুখ চেপে ধরে পার্শ্ববর্তী একটি ঘন বাঁশঝাড়ে নিয়ে যায়। সেখানে শিশুটির ওপর চালানো হয় অমানবিক ও পাশবিক নির্যাতন।
একপর্যায়ে শিশুটির গগণবিদারী আর্তচিৎকার শুনতে পেয়ে স্থানীয় লোকজন এবং তার পরিবারের সদস্যরা ঘটনাস্থলের দিকে ছুটে যান। লোকজনের উপস্থিতি টের পেয়ে অভিযুক্ত রিফাত কৌশলে অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে ঘটনাস্থল থেকে দ্রুত পালিয়ে যায়। রক্তাক্ত ও গুরুতর আহত অবস্থায় শিশুটিকে উদ্ধার করে তৎক্ষণাৎ পলাশবাড়ী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যাওয়া হয়।
চিকিৎসা ও বর্তমান শারীরিক অবস্থা
পলাশবাড়ী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কর্তব্যরত চিকিৎসকরা শিশুটির শারীরিক অবস্থা আশঙ্কাজনক দেখে তাকে প্রাথমিক চিকিৎসা প্রদান করেন এবং উন্নত চিকিৎসার জন্য দ্রুত জেলা সদরের গাইবান্ধা জেনারেল হাসপাতালে স্থানান্তরের পরামর্শ দেন। বর্তমানে শিশুটি সেখানে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রয়েছে। হাসপাতালের চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, শিশুটি কেবল শারীরিকভাবেই নয়, বরং মানসিকভাবেও প্রচণ্ড আতঙ্কগ্রস্ত (Trauma) হয়ে পড়েছে। তার প্রয়োজনীয় ডাক্তারি পরীক্ষা ও ফরেনসিক নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে এবং রিপোর্ট আসার পর আইনগত প্রক্রিয়া আরও ত্বরান্বিত হবে।
আইনি পদক্ষেপ ও প্রশাসনের ভূমিকা
এই ঘটনায় গত ৫ এপ্রিল (রবিবার) রাতে নির্যাতিতা শিশুটির পিতা বাদী হয়ে পলাশবাড়ী থানায় একটি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে মামলা দায়ের করেন। মামলার নথিতে ভবানীপুর গ্রামের আজাদুল মিয়ার ছেলে রিফাতকে একমাত্র অভিযুক্ত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
পলাশবাড়ী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সারোয়ারে আলম খান ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করে জানান যে, পুলিশ মামলাটি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে তদন্ত করছে। তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, “ঘটনাটি অত্যন্ত দুঃখজনক ও ন্যাক্কারজনক। আমরা অভিযুক্তকে গ্রেফতার করতে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালাচ্ছি এবং ইতোমধ্যে সম্ভাব্য বিভিন্ন স্থানে একাধিক অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। অপরাধী যত প্রভাবশালীই হোক না কেন, তাকে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা হবে।”
ঘটনার সংক্ষিপ্ত তথ্যচিত্র
অপ্রীতিকর এই ঘটনার মূল তথ্যগুলো নিচের সারণিতে সংক্ষিপ্ত আকারে তুলে ধরা হলো:
| ক্রমিক | বিষয় | বিবরণ |
| ১ | ঘটনার স্থান | ভবানীপুর গ্রাম, বরিশাল ইউনিয়ন, পলাশবাড়ী, গাইবান্ধা। |
| ২ | ভুক্তভোগীর পরিচয় | স্থানীয় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির ছাত্রী। |
| ৩ | প্রধান অভিযুক্ত | রিফাত (১৯), পিতা: আজাদুল মিয়া। |
| ৪ | ঘটনার সময় | ৪ এপ্রিল, ২০২৬ (শনিবার), আনুমানিক সন্ধ্যা। |
| ৫ | মামলা দায়ের | ৫ এপ্রিল, ২০২৬ (রবিবার) রাত। |
| ৬ | বর্তমান অবস্থা | গাইবান্ধা জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। |
| ৭ | তদন্তকারী সংস্থা | পলাশবাড়ী থানা পুলিশ। |
সামাজিক অস্থিরতা ও জননিরাপত্তার দাবি
এই পৈশাচিক ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর থেকে স্থানীয় গ্রামবাসীর মধ্যে ক্ষোভের আগুন জ্বলছে। এলাকার সচেতন মহল ও সাধারণ মানুষ অভিযুক্ত রিফাতের দ্রুত গ্রেপ্তার ও ফাঁসির দাবিতে সোচ্চার হয়ে উঠেছেন। গ্রামের বাসিন্দাদের অভিযোগ, এলাকায় কিশোর গ্যাং কালচার ও মাদকাসক্তি বাড়ার কারণে নারীদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হচ্ছে।
গাইবান্ধার সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা এই ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালের মাধ্যমে বিচারকার্য সম্পন্ন করার দাবি তুলেছেন। তারা মনে করেন, এ ধরণের অপরাধের বিচার যদি দ্রুত ও দৃশ্যমান না হয়, তবে সমাজে অপরাধ প্রবণতা আরও বাড়বে। শিশু অধিকার রক্ষায় নিয়োজিত বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন ভুক্তভোগী পরিবারটিকে সব ধরণের আইনি ও মানসিক সহায়তা প্রদানের আশ্বাস দিয়েছে।
পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, আসামী রিফাত ও তার পরিবারের সদস্যরা বর্তমানে পলাতক থাকলেও গোয়েন্দা নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। খুব শীঘ্রই তাকে গ্রেপ্তার করে বিজ্ঞ আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে প্রেরণ করা হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছে পুলিশ। স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানও ভুক্তভোগী পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছেন এবং ন্যায়বিচার নিশ্চিতে প্রশাসনের ওপর আস্থা রাখার অনুরোধ জানিয়েছেন।
