অন্ধত্ব জয় করে আজান দেওয়া মুয়াজ্জিনের বিদায়

নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলার শতবর্ষী অন্ধ মুয়াজ্জিন আব্দুর রহমান মোল্লার মৃত্যুতে এক অনন্য জীবনসংগ্রামের অবসান ঘটেছে। রোববার (৫ এপ্রিল) সন্ধ্যা সাড়ে ৬টার দিকে নিজ বাড়িতে তিনি শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল প্রায় ১২০ বছর। পরদিন সোমবার (৬ এপ্রিল) সকাল ৯টায় বড়দেহা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়। তার ইন্তেকালে পুরো এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

নগর ইউনিয়নের বড়দেহা গ্রামের এই প্রবীণ মানুষটি শুধু বয়সের দিক থেকে নয়, জীবনদর্শন ও কর্মনিষ্ঠার কারণেও ছিলেন ব্যতিক্রমী। জীবনের শেষ প্রায় দুই দশক তিনি দৃষ্টিশক্তিহীন অবস্থায় কাটালেও ধর্মীয় দায়িত্ব পালনে কখনো অবহেলা করেননি। বরং অন্ধত্বকে জয় করে তিনি হয়ে ওঠেন আত্মনির্ভরতার এক উজ্জ্বল প্রতীক। ২০২৪ সালের মে মাসে তার সংগ্রামী জীবনগাথা গণমাধ্যমে প্রকাশ পেলে দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়।

পরিবারের সদস্যরা জানান, প্রায় ২২ বছর আগে এক দুর্ঘটনায় তিনি দৃষ্টিশক্তি হারান। তবে এই শারীরিক সীমাবদ্ধতা তার মনোবলকে ভেঙে দিতে পারেনি। বরং তিনি আরও বেশি করে ধর্মচর্চায় মনোনিবেশ করেন। দৃষ্টিশক্তি হারানোর কিছুদিন পর বড় ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে তিনি পবিত্র হজ পালন করেন। হজ থেকে ফিরে এসে তিনি ইসলামের খেদমতে নিজেকে সম্পূর্ণভাবে উৎসর্গ করার দৃঢ় সিদ্ধান্ত নেন।

আব্দুর রহমান মোল্লা নিজের পাঁচ শতাংশ জমির ওপর একটি পাকা মসজিদ নির্মাণ করেন এবং সেটি মসজিদের নামে দান করে দেন। এরপর তিনি নিজেই সেই মসজিদের মুয়াজ্জিন হিসেবে দায়িত্ব পালন শুরু করেন। কিন্তু বাড়ি থেকে মসজিদের দূরত্ব প্রায় ২০০ মিটার হওয়ায় দৃষ্টিহীন অবস্থায় সেখানে নিয়মিত যাতায়াত করা ছিল অত্যন্ত কঠিন।

এই সমস্যা সমাধানে তিনি নিজেই একটি অভিনব পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন। তার নির্দেশনায় পরিবারের সদস্যরা বাড়ি থেকে মসজিদ পর্যন্ত রাস্তার পাশে দড়ি ও বাঁশ স্থাপন করেন। প্রথমদিকে নাতিদের সহায়তায় চলাচল করলেও অল্পদিনের মধ্যেই তিনি সম্পূর্ণ স্বনির্ভর হয়ে ওঠেন। একটি লাঠি এবং দড়ি-বাঁশের সহায়তায় তিনি প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের আগে মসজিদে গিয়ে আজান দিতেন। তার এই অবিচল নিষ্ঠা, আত্মবিশ্বাস ও ধর্মভীরুতা স্থানীয়দের গভীরভাবে অনুপ্রাণিত করেছে।

তার জীবনসংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য নিচে উপস্থাপন করা হলো—

বিষয়তথ্য
নামআব্দুর রহমান মোল্লা
বয়সপ্রায় ১২০ বছর
ঠিকানাবড়দেহা গ্রাম, বড়াইগ্রাম, নাটোর
দায়িত্বমসজিদের মুয়াজ্জিন
দৃষ্টিশক্তি হারানপ্রায় ২২ বছর আগে
যাতায়াত পদ্ধতিদড়ি ও বাঁশের সহায়তা
বিশেষ অবদাননিজ জমিতে মসজিদ নির্মাণ ও দান

তার মৃত্যুতে শোক প্রকাশ করেছেন নাটোর-৪ আসনের সংসদ সদস্য আব্দুল আজিজ। শোকবার্তায় তিনি বলেন, “অন্ধত্বকে জয় করে দ্বীনের পথে আব্দুর রহমান মোল্লার অক্লান্ত সাধনা আমাদের জন্য এক অনন্য দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।” তিনি মরহুমের আত্মার মাগফিরাত কামনা করেন এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, তিনি শুধু একজন মুয়াজ্জিনই ছিলেন না, বরং ছিলেন এক অনুকরণীয় মানুষ। প্রতিকূলতাকে জয় করে দায়িত্ব পালনের যে দৃষ্টান্ত তিনি স্থাপন করেছেন, তা সমাজে বিরল। তার জীবন সংগ্রাম ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য প্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।

আব্দুর রহমান মোল্লার জীবন আমাদের শেখায়—মানুষের ইচ্ছাশক্তি ও বিশ্বাস যদি অটুট থাকে, তবে কোনো বাধাই তাকে থামাতে পারে না। তার বিদায়ে একটি যু