মানবতার জয়: ব্যবসার সীমা ছাড়িয়ে মানবিকতা

বিশ্বের বৃহৎ কর্পোরেট সাম্রাজ্য, কোটি কোটি ডলারের মার্কেটিং বাজেট, ঝকঝকে ব্র্যান্ডিং এবং আন্তর্জাতিক উপস্থিতি থাকা সত্ত্বেও সৌদি আরবে কেন স্থানীয় চেইন আল-বাইক KFC বা McDonald’s-এর চেয়ে মানুষের হৃদয়ে আলাদা জায়গা করে নিতে সক্ষম হয়েছে? এর রহস্য ব্যবসায়িক কৌশল বা মুনাফার হিসাবের মধ্যে নেই—রহস্যটি নিহিত মানবিকতায়।

যেখানে ব্যবসার একমাত্র লক্ষ্য থাকে মুনাফা, সেখানে প্রতিযোগিতা স্বাভাবিক। কিন্তু যেখানে ব্যবসার মূল লক্ষ্য হয় মানুষ, সহমর্মিতা এবং সামাজিক দায়বদ্ধতা, সেখানে প্রতিযোগিতা ধীরে ধীরে সম্মানের রূপ নেয়। আল-বাইকের উদাহরণ ঠিক এমন এক ব্যতিক্রম।

১৯৭৪ সালে জেদ্দার এক সাধারণ গুদামঘর থেকে আল-বাইক যাত্রা শুরু করে। প্রতিষ্ঠাতা শাকুর আবু গাজারাহ হয়তো কল্পনাও করেননি, তার ছোট উদ্যোগ একদিন মানবিক দর্শনের প্রতীক হয়ে উঠবে। কিন্তু ভাগ্যের নির্মমতা—ব্যবসা যখন স্থিতিশীল হতে শুরু করেছিল, তখন তিনি প্রয়াত হন। পেছনে রয়ে যায় ঋণ ও অনিশ্চয়তার বোঝা।

এই কঠিন সময়ে তার দুই সন্তান—ইহসান আবু গাজারাহ এবং রামি আবু গাজারাহ—একটি অসম্ভব সিদ্ধান্ত নেন। ব্যবসার নিয়ম অনুযায়ী লোকসান কমাতে হলে খরচ কমাতে হয়, কিন্তু তারা উল্টো পথে যান। প্রতিটি বিক্রিত মিল থেকে একটি রিয়াল দান করার প্রতিশ্রুতি তারা কখনও ভাঙেননি। হাতে ছিল না বড় কোনো প্রচারণা, কিন্তু ছিল মানুষের জন্য নিঃস্বার্থ ভালোবাসা।

এই নিষ্ঠা ও মানবিকতার অনন্য দৃষ্টান্ত আজ “সিক্রেট সস” হিসেবে পরিচিত, যা আসলে কোনো রেসিপি নয়, বরং মানবতার স্বাদ। কর্পোরেট বিশ্বের ROI, মুনাফা এবং বাজার দখলের কৌশল হিসাবের মধ্যে আমরা আজকাল হারিয়ে যাই, কিন্তু আল-বাইক আমাদের শেখায়—মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতা, সততা ও সহমর্মিতাই সবচেয়ে বড় বিনিয়োগ।

এমন মানবিক উদাহরণ শুধু সৌদি আরবে সীমাবদ্ধ নয়। আমাদের দেশে বগুড়ার ঐতিহ্যবাহী আকবরিয়া গ্র্যান্ড হোটেল শত বছরেরও বেশি সময় ধরে প্রতিদিন ১২০০–১৫০০ মানুষকে গরম ভাত খাইয়ে আসছে। অর্থনৈতিক সংকট এসেছে, সময় বদলেছে, পরিস্থিতি কঠিন হয়েছে—তবুও মানবতার চুলা থেমে যায়নি।

মানবতার পথ কখনো বন্ধ হয় না। ইতিহাস সাক্ষী—মানবতার কখনো পরাজয় হয়নি, ভবিষ্যতেও হবে না। তাই আসুন আমরা শুধু সফলতার পিছনে ছুটে না গিয়ে সার্থকতার পথে হাঁটি। ব্যবসা করি মানুষের জন্য, অর্জন করি কিন্তু ভাগ করতে শিখি। মানবতা প্রসারিত হোক, সহমর্মিতা বিস্তৃত হোক এবং ভালোবাসার শক্তি বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ুক।

লেখকঃ সম্পাদক ও প্রকাশক—খবরওয়ালা ও জি-লাইভ ২৪

এবিএম জাকিরুল হক টিটন