মধ্যপ্রাচ্যে চলমান যুদ্ধ এবং বৈশ্বিক অস্থিরতার কারণে জ্বালানি তেল আমদানি ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কায় বাংলাদেশ সরকার অতিরিক্ত তেল সরবরাহ নিশ্চিত করতে ভারতের দিকে নজর দিয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে আজ (১১ মার্চ) সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে ভারত সরকারের কাছে চিঠি পাঠিয়েছে, যাতে ডিজেল ও অন্যান্য জ্বালানি তেলের সরবরাহ বাড়ানো যায়।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ সাংবাদিকদের জানান, “ভারত থেকে পাইপলাইনে তেল আমদানি করা হয়। আপৎকালীন পরিস্থিতিতে পাইপলাইনে তেলের সরবরাহ বাড়ানোর বিষয়ে ভারত সরকারের কাছে অনুরোধ জানানো হয়েছে। কতটুকু তেল সরবরাহ বাড়বে, তা ভারতের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করবে।”
এর আগে মন্ত্রী ভারতের হাইকমিশনার প্রণয় কুমার ভার্মা-এর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন। সাক্ষাতে দুই দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতের পারস্পরিক সহযোগিতা, বিদ্যুৎ আমদানি, পাইপলাইনে তেল সরবরাহ এবং নেপাল থেকে বিদ্যুৎ আমদানিসহ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হয়। সাক্ষাতের পর হাইকমিশনার জানান, চিঠিটি ভারত সরকারের কাছে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে এবং তারা বিষয়টি বিবেচনা করবে।
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) সূত্র জানিয়েছে, ২০১৭ সালের ২২ অক্টোবর নুমালিগড় রিফাইনারি লিমিটেডের সঙ্গে ডিজেল আমদানির চুক্তি হয়েছে এবং ২০২৩ সালের মার্চে তা আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হয়। চুক্তি অনুযায়ী ২০২৬ সালে মোট ১ লাখ ২০ হাজার টন ডিজেল সরবরাহের কথা। এর বাইরে আরও ৬০ হাজার টন ডিজেল দেওয়া যেতে পারে, তবে তা বাধ্যতামূলক নয়। প্রতি ধাপে সরবরাহ হয় ৫,০০০ টন।
ভারতের কেন্দ্রীয় সংস্থা ইন্ডিয়া অয়েল কোম্পানি লিমিটেড (আইওসিএল) ২০২০ সালে বিপিসির কাছে তেল সরবরাহ শুরু করে। ২০২৬ সালের জানুয়ারি–জুন পর্যন্ত এ থেকে ১ লাখ ৫ হাজার টন তেল আসার কথা, যার মধ্যে ডিজেল ২০ হাজার টন, ফার্নেস তেল ৫০ হাজার টন, অকটেন ২৫ হাজার টন এবং জেট ফুয়েল ১০ হাজার টন। সরবরাহ করা হয় সমুদ্রপথে।
বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের কারণে বিপিসি ৮ মার্চ ভারত থেকে তেলের আমদানি বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে। এতে বলা হয়েছে, মার্চে চার ধাপে ২০ হাজার টন এবং এপ্রিলে পাঁচ ধাপে ২৫ হাজার টন ডিজেল সরবরাহ করা যেতে পারে। পরবর্তী মাসগুলোতেও একই হারে সরবরাহ করা সম্ভব। সমুদ্রপথে প্রতি ধাপে ৩০ হাজার টন করে চারটি জাহাজে ১ লাখ ২০ হাজার টন ডিজেল আনার পরিকল্পনা করা যেতে পারে।
ভারত থেকে জ্বালানি তেলের সরবরাহ ও চুক্তির বিবরণ
| উৎস/চুক্তি | বছর/মাস | তেলের পরিমাণ (টন) | সরবরাহের মাধ্যম | মন্তব্য |
|---|---|---|---|---|
| নুমালিগড় রিফাইনারি লিমিটেড | ২০২৩–২০২৬ | ১,২০,০০০ (চুক্তিবদ্ধ), ৬০,০০০ অতিরিক্ত সম্ভাব্য | পাইপলাইন | বাধ্যতামূলক নয়, ৫,০০০ টন প্রতি ধাপে |
| আইওসিএল | ২০২০–২০২৬ (জানুয়ারি–জুন) | ১,০৫,০০০ | সমুদ্রপথ | ডিজেল ২০,০০০, ফার্নেস ৫০,০০০, অকটেন ২৫,০০০, জেট ফুয়েল ১০,০০০ |
| বিপিসি প্রস্তাব (মার্চ–এপ্রিল ২০২৬) | মার্চ–এপ্রিল | ৪৫,০০০ | পাইপলাইন | মার্চ ৪ ধাপে ২০,০০০, এপ্রিলে ৫ ধাপে ২৫,০০০ টন |
দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে ভারতের সহায়তা এবং স্থায়ী সম্পর্ক এই পদক্ষেপকে আরও দৃঢ় করেছে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যের অস্থির পরিস্থিতিতে ভারতের সঙ্গে সমন্বিত উদ্যোগ দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
সরকার আশা করছে, এই অতিরিক্ত তেল সরবরাহ দ্রুত কার্যকর হলে দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে কোনো ধরনের সংকট সৃষ্টি হবে না, এবং মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার প্রভাব তুলনামূলকভাবে সীমিত থাকবে।
