ছিনতাই আতঙ্কে ঝুঁকিতে বৈদেশিক মুদ্রা আয়কারী বিপিও খাত

রাজধানীতে ক্রমবর্ধমান ছিনতাই পরিস্থিতি এখন শুধু সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা সংকট নয়; এটি দেশের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের একটি গুরুত্বপূর্ণ খাত—বিজনেস প্রসেস আউটসোর্সিং (বিপিও) শিল্পের জন্যও বড় হুমকিতে পরিণত হয়েছে। বিদেশি প্রতিষ্ঠানগুলোর ব্যাকঅফিস কার্যক্রম পরিচালনাকারী এসব বিপিও প্রতিষ্ঠানের অধিকাংশই যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের সময়সূচি অনুসরণ করে পরিচালিত হয়। ফলে কর্মীদের মূল কাজের সময় বাংলাদেশের গভীর রাত থেকে ভোর পর্যন্ত বিস্তৃত থাকে। রাতভর দায়িত্ব পালন শেষে ভোরে বাসায় ফেরার পথে কর্মীদের একটি বড় অংশ এখন ছিনতাইকারীদের প্রধান টার্গেটে পরিণত হচ্ছেন।

খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় বিপিও কর্মীদের ওপর হামলা, ছিনতাই ও শারীরিক নির্যাতনের ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। অফিস থেকে ফেরার পথে নয়, অনেক সময় নিজ নিজ বাসার গলিতেও ছিনতাইকারীদের কবলে পড়ছেন তারা। এতে করে কর্মীদের মধ্যে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে এবং প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের কার্যক্রম পরিচালনায় নতুন ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়ছে।

রাতের কর্মঘণ্টা, ভোরের ঝুঁকিপূর্ণ যাত্রা

বাংলাদেশে কার্যরত অধিকাংশ আন্তর্জাতিক বিপিও প্রতিষ্ঠানের কাজের ধরন ‘টাইম-জোন নির্ভর’। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক কোম্পানিগুলোর ব্যাকঅফিস সেবা দেওয়ার কারণে এসব প্রতিষ্ঠানের কাজ চলে বাংলাদেশের রাতের সময়। কর্মীরা সন্ধ্যা বা রাত থেকে কাজ শুরু করে ভোররাত বা সকালে শিফট শেষ করেন।

অনেক প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব পরিবহন ব্যবস্থা থাকলেও তা সব কর্মীর জন্য পর্যাপ্ত নয়। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে অফিসের গাড়ি কর্মীদের বাসার সামনে না গিয়ে নিকটবর্তী প্রধান সড়ক বা মোড়ে নামিয়ে দেয়। এরপর অন্ধকার, নির্জন সড়ক কিংবা সরু গলি দিয়ে হেঁটে বা রিকশায় বাসায় ফিরতে হয় কর্মীদের।

আবার অনেক কর্মী নিজস্ব যানবাহনে, বিশেষ করে মোটরসাইকেলে, যাতায়াত করেন। রাতভর কাজের ক্লান্তি নিয়ে ভোরের নির্জন রাস্তায় চলাচলের সময় তারা হয়ে ওঠেন ছিনতাইকারীদের সহজ শিকার। রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় মোটরসাইকেল আরোহী বিপিও কর্মীদের থামিয়ে মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ, টাকা-পয়সা ছিনিয়ে নেওয়ার ঘটনা বাড়ছে। অনেক ক্ষেত্রে বাধা দিলে হামলার শিকারও হতে হচ্ছে।

খাত সংশ্লিষ্টদের দাবি, গত কয়েক মাসে অসংখ্য বিপিও কর্মী অফিস থেকে ফেরার পথে আক্রান্ত হয়েছেন। কেউ ছুরিকাহত হয়েছেন, কেউ মারধরের শিকার হয়েছেন, আবার কেউ গুরুতর আহত হয়ে দীর্ঘদিন কর্মস্থলে অনুপস্থিত থেকেছেন।

বাসার গলিতেও নিরাপত্তাহীনতা

উদ্বেগজনক বিষয় হলো, ছিনতাই এখন আর কেবল প্রধান সড়ক বা নির্জন এলাকায় সীমাবদ্ধ নেই। অনেক বিপিও কর্মী জানিয়েছেন, অফিস থেকে ফিরে বাসার কাছাকাছি এলাকায়, এমনকি নিজ নিজ বাসার গলিতেও তারা ছিনতাইয়ের শিকার হচ্ছেন। ছিনতাইকারীরা আগে থেকেই ওঁৎ পেতে থাকে এবং সুযোগ বুঝে হামলা চালায়।

ফলে কর্মীদের মধ্যে এক ধরনের মানসিক ভীতি তৈরি হয়েছে। রাতের শিফটে কাজ করতে অনেকে অনীহা প্রকাশ করছেন। পরিবারের সদস্যরাও উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছেন, যা কর্মীদের মানসিক স্থিতি ও উৎপাদনশীলতায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।

টাইম-বাউন্ড কাজ, বাড়ছে চুক্তি হারানোর ঝুঁকি

বিপিও খাতের কাজ অত্যন্ত সময়নির্ভর ও চুক্তিভিত্তিক। বিদেশি কোম্পানিগুলো নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে কাজ সম্পন্ন করার কঠোর শর্ত আরোপ করে। নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করতে না পারলে চুক্তি বাতিল হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি থাকে। আর একটি বড় চুক্তি বাতিল হওয়া মানে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের জন্য মারাত্মক আর্থিক ক্ষতি, এমনকি পুরো কার্যক্রম স্থবির হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাও তৈরি হতে পারে।

এই পরিস্থিতিতে কোনো গুরুত্বপূর্ণ কর্মী বা ‘কি-পার্সন’ ছিনতাইয়ের শিকার হয়ে আহত হলে বা দীর্ঘদিন কাজে অনুপস্থিত থাকলে পুরো বিভাগ কার্যত অচল হয়ে পড়তে পারে। একটি গুরুত্বপূর্ণ ইউনিট বন্ধ হয়ে গেলে নির্ধারিত সময়ের কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব হয় না, ফলে আন্তর্জাতিক ক্লায়েন্টদের আস্থা নষ্ট হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।

উদ্যোক্তারা বলছেন, এমনিতেই বৈশ্বিক প্রতিযোগিতা, ডলার সংকট, প্রযুক্তিগত অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং দক্ষ জনবলের চাহিদা পূরণের মতো নানা প্রতিকূলতার মধ্যে বিপিও খাত কাজ করছে। তার ওপর কর্মীদের নিরাপত্তা সংকট যুক্ত হওয়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠছে।

বৈদেশিক মুদ্রা আয়ে সম্ভাবনাময় খাতের সামনে নতুন হুমকি

বাংলাদেশের বিপিও খাত বর্তমানে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের একটি সম্ভাবনাময় খাত হিসেবে বিবেচিত। তথ্যপ্রযুক্তি নির্ভর সেবা খাতে তরুণদের কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং আন্তর্জাতিক বাজারে দেশের অবস্থান শক্তিশালী করতে এই শিল্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।

কিন্তু ক্রমবর্ধমান ছিনতাই পরিস্থিতি যদি নিয়ন্ত্রণে না আসে, তাহলে বিদেশি ক্লায়েন্টরা বাংলাদেশকে অনিরাপদ গন্তব্য হিসেবে বিবেচনা করতে পারেন। এতে নতুন বিনিয়োগ কমে যেতে পারে এবং বিদ্যমান চুক্তিগুলোও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

খাত সংশ্লিষ্ট উদ্যোক্তারা আশঙ্কা করছেন, কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না গেলে অনেক প্রতিষ্ঠান রাতের শিফট কমিয়ে দিতে বাধ্য হবে, যা সরাসরি আন্তর্জাতিক কাজের সক্ষমতা কমিয়ে দেবে।

আতঙ্ক কমছে না, বাড়ছে সহিংসতা

সরকার ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর পক্ষ থেকে নানা উদ্যোগের কথা বলা হলেও বাস্তবে পরিস্থিতির খুব বেশি উন্নতি হয়নি বলে অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের। অনেক বিপিও কর্মীর দাবি, টহল বাড়ানোর ঘোষণা থাকলেও নির্দিষ্ট ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় দৃশ্যমান নিরাপত্তা তৎপরতা পর্যাপ্ত নয়।

বরং ছিনতাইকারীরা আগের চেয়ে আরও হিংস্র হয়ে উঠছে। সামান্য দেরি বা প্রতিরোধ দেখলেই তারা ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করছে। অনেক ক্ষেত্রে কোনো কথাবার্তা ছাড়াই হামলা চালিয়ে দ্রুত পালিয়ে যাচ্ছে।

এই পরিস্থিতি বিপিও খাতে কর্মরত তরুণদের মধ্যে গভীর নিরাপত্তাহীনতা তৈরি করেছে। তারা মনে করছেন, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কাজ করে দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখলেও নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত হচ্ছে না।

খাত সংশ্লিষ্টদের দাবি

বিপিও খাতের উদ্যোক্তা ও সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না গেলে এই সম্ভাবনাময় শিল্প মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়বে। তারা জোর দিয়ে বলছেন, রাত ও ভোরের সময় আবাসিক এলাকা, অফিসপাড়া এবং কর্মীদের নিয়মিত যাতায়াতের রুটগুলোতে বিশেষ পুলিশ টহল জোরদার করা জরুরি। বিশেষ করে গভীর রাত থেকে সকাল পর্যন্ত সময়টিকে উচ্চঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর দৃশ্যমান উপস্থিতি বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন তারা, যাতে ছিনতাইকারীরা সহজে সক্রিয় হতে না পারে।

উদ্যোক্তারা আরও বলছেন, মোটরসাইকেল টহল বৃদ্ধি করা এবং সন্দেহভাজন মোটরসাইকেল ও নাম্বারপ্লেটবিহীন যানবাহনের ওপর নিয়মিত তল্লাশি চালানো প্রয়োজন। কারণ সাম্প্রতিক বেশিরভাগ ছিনতাই দ্রুতগতির মোটরসাইকেল ব্যবহার করেই সংঘটিত হচ্ছে। দ্রুতগতির এসব যানবাহন শনাক্ত ও নিয়ন্ত্রণ করা গেলে ছিনতাইয়ের ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসতে পারে বলে তারা মনে করেন।

ছিনতাই সংক্রান্ত মামলাগুলোর দ্রুত তদন্ত ও বিচার নিশ্চিত করার বিষয়টিকেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন খাত সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, বিচারহীনতার সংস্কৃতি অপরাধীদের উৎসাহিত করে। গ্রেপ্তারের পর সহজে জামিন পাওয়া বা দীর্ঘসূত্রতায় মামলা ঝুলে থাকার কারণে ছিনতাইকারীরা দ্রুত আবার অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। তাই দ্রুত বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা গেলে অপরাধ প্রবণতা কমবে।

এছাড়া কর্মীদের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করতে প্রণোদনা বা সরকারি সহায়তার ব্যবস্থাও করার আহ্বান জানিয়েছেন বিপিও উদ্যোক্তারা। অনেক প্রতিষ্ঠান নিজস্ব পরিবহন ব্যবস্থা চালু করতে চাইলেও অতিরিক্ত ব্যয়ের কারণে তা সবসময় সম্ভব হয় না। সরকার যদি নিরাপদ পরিবহন ব্যবস্থায় সহায়তা দেয় বা এ বিষয়ে নীতিগত প্রণোদনা দেয়, তাহলে কর্মীদের ঝুঁকি অনেকাংশে কমানো সম্ভব হবে।

তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, বিপিও খাত কেবল একটি বাণিজ্যিক শিল্প নয়; এটি দেশের ডিজিটাল অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি এবং বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। এই খাতে কর্মরত তরুণদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা মানে শুধু ব্যক্তি সুরক্ষা নয়, বরং দেশের অর্থনৈতিক স্বার্থ, আন্তর্জাতিক ভাবমূর্তি এবং প্রযুক্তিনির্ভর ভবিষ্যৎকে সুরক্ষিত করা।

রাজধানীতে বাড়তে থাকা ছিনতাই পরিস্থিতি এখন অর্থনৈতিক নিরাপত্তার সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত হয়ে পড়েছে। বিপিও খাতের মতো সময়নির্ভর ও আন্তর্জাতিকভাবে সংযুক্ত শিল্পের জন্য কর্মীদের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। অন্যথায় দেশের ভাবমূর্তি, বৈদেশিক চুক্তি এবং হাজারো তরুণের কর্মসংস্থান একসঙ্গে ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

ছিনতাই দমনে কার্যকর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ এখন সময়ের দাবি—নচেৎ এই নিরাপত্তা সংকট ভবিষ্যতে বড় অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে।