বিশ্ববিখ্যাত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘ওপেনএআই’ বর্তমানে এক নজিরবিহীন অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী স্যাম অল্টম্যানের নেতৃত্বাধীন এই সংস্থাটি মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর পেন্টাগনের সাথে একটি বিতর্কিত চুক্তিতে স্বাক্ষর করার পর থেকেই বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। এই চুক্তির প্রতিবাদে এবং নৈতিক আদর্শের সাথে সাংঘর্ষিক হওয়ার কারণে ওপেনএআই-এর হার্ডওয়্যার বিভাগের প্রভাবশালী প্রধান ক্যাটলিন কালিনোস্কি তাঁর পদ থেকে ইস্তফা দিয়েছেন। তাঁর এই প্রস্থান কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নৈতিক ব্যবহার এবং সামরিকায়নের বিতর্ককে নতুন করে উসকে দিয়েছে।
Table of Contents
কালিনোস্কির পদত্যাগ ও নৈতিক সংঘাত
ক্যাটলিন কালিনোস্কি প্রযুক্তি বিশ্বের এক পরিচিত নাম। ফেসবুকের মূল প্রতিষ্ঠান মেটাতে (Meta) দীর্ঘ সময় সফলতার সাথে কাজ করার পর ২০২৪ সালের নভেম্বরে তিনি ওপেনএআই-তে যোগ দেন। মেটাতে তিনি মূলত অগমেন্টেড রিয়েলিটি (AR) চশমা বা ‘অরিয়ন’ প্রজেক্টের নেতৃত্বে ছিলেন। ওপেনএআই-তে তাঁর মূল লক্ষ্য ছিল রোবটিক্স এবং এআই চালিত বিভিন্ন অত্যাধুনিক হার্ডওয়্যার পণ্য তৈরি করা।
পদত্যাগ পত্রে কালিনোস্কি স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছেন যে, পেন্টাগনের গোপনীয় নেটওয়ার্কে ওপেনএআই-এর মডেল ব্যবহারের সিদ্ধান্ত তিনি মেনে নিতে পারছেন না। তাঁর মতে, জাতীয় নিরাপত্তায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রয়োজনীয়তা থাকলেও বিচার বিভাগীয় স্বচ্ছতা ছাড়া সাধারণ মানুষের ওপর নজরদারি এবং প্রাণঘাতী সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে এআই-এর অবাধ ব্যবহার অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। বিশেষ করে মানুষের সরাসরি অনুমোদন ছাড়া এআই যখন সিদ্ধান্ত নিতে শুরু করবে, তখন তা ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয় ডেকে আনতে পারে।
পেন্টাগন-ওপেনএআই চুক্তির সারসংক্ষেপ
নিচে এই বিতর্কিত চুক্তির বিভিন্ন দিক এবং এর প্রভাব একটি টেবিলের মাধ্যমে তুলে ধরা হলো:
| বিষয়ের বিবরণ | তথ্যের সারসংক্ষেপ |
| চুক্তির পক্ষদ্বয় | মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর (পেন্টাগন) এবং ওপেনএআই (OpenAI)। |
| চুক্তির উদ্দেশ্য | পেন্টাগনের ক্লাসিফাইড বা গোপনীয় নেটওয়ার্কে জিপিটি-৪ মডেলের প্রয়োগ। |
| বিতর্কের কারণ | ইতিপূর্বে ওপেনএআই সামরিক কাজে এআই ব্যবহার না করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। |
| জনগণের প্রতিক্রিয়া | কয়েক লক্ষ ব্যবহারকারী ইতোমধ্যে ‘চ্যাটজিপিটি প্লাস’ সাবস্ক্রিপশন বাতিল করেছেন। |
| মূল উদ্বেগ | নজরদারি বৃদ্ধি এবং স্বয়ংক্রিয় অস্ত্র ব্যবস্থায় এআই-এর সম্ভাব্য ব্যবহার। |
জনরোষ ও সাবস্ক্রিপশন বাতিল
পেন্টাগনের সাথে এই গোপনীয় চুক্তির খবর গত সপ্তাহে প্রকাশ্যে আসার পর থেকেই ওপেনএআই-এর জনপ্রিয় চ্যাটবট ‘চ্যাটজিপিটি’-এর ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। বিশ্বজুড়ে কয়েক লক্ষ সচেতন ব্যবহারকারী তাঁদের পেইড সাবস্ক্রিপশন বাতিল করেছেন। তাঁদের মতে, যে প্রযুক্তি মানবকল্যাণের কথা বলে যাত্রা শুরু করেছিল, তা এখন যুদ্ধের রসদ জোগাতে ব্যবহৃত হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই ওপেনএআই-এর এই পদক্ষেপকে “প্রাথমিক আদর্শ থেকে বিচ্যুতি” হিসেবে অভিহিত করেছেন।
সামরিকায়ন ও এআই-এর ভবিষ্যৎ
ওপেনএআই-এর নীতিমালায় আগে স্পষ্টভাবে বলা ছিল যে, তাদের প্রযুক্তি কোনো ধরনের সামরিক বা যুদ্ধাস্ত্র তৈরিতে ব্যবহৃত হবে না। তবে সম্প্রতি পেন্টাগনের সাথে এই অংশীদারিত্বের জন্য তারা তাদের নীতিমালা থেকে “সামরিক ব্যবহার নিষিদ্ধ” বিষয়ক বাক্যটি সরিয়ে ফেলেছে। সমালোচকদের দাবি, মার্কিন সামরিক বাহিনীকে প্রযুক্তি সরবরাহের মাধ্যমে ওপেনএআই পরোক্ষভাবে বিশ্বজুড়ে চলা বিভিন্ন সংঘাত ও সামরিক কার্যক্রমে নিজেদের সম্পৃক্ত করছে। কালিনোস্কির মতো শীর্ষ কর্মকর্তাদের পদত্যাগ এই ইঙ্গিত দেয় যে, প্রতিষ্ঠানের ভেতরেও এই সিদ্ধান্ত নিয়ে গভীর মতভেদ বিদ্যমান।
প্রযুক্তিবিদরা মনে করছেন, ক্যাটলিন কালিনোস্কির পদত্যাগ ওপেনএআই-এর রোবটিক্স এবং হার্ডওয়্যার পণ্য উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় বড় ধরনের স্থবিরতা নিয়ে আসতে পারে। এটি কেবল একজন কর্মকর্তার চলে যাওয়া নয়, বরং সিলিকন ভ্যালিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নৈতিক সীমা নির্ধারণের ক্ষেত্রে একটি মাইলফলক হয়ে থাকবে।
