‘শান্তির প্রেসিডেন্ট’ থেকে রণংদেহী ট্রাম্প: যুদ্ধের নেপথ্য আখ্যান

২০২৪ সালের নির্বাচনী প্রচারণায় ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রধান অঙ্গীকার ছিল আমেরিকার ‘চিরন্তন যুদ্ধ’ (Forever Wars) বন্ধ করা। নিজেকে ‘শান্তির প্রেসিডেন্ট’ হিসেবে উপস্থাপন করে তিনি বারবার বলেছিলেন, জর্জ ডব্লিউ বুশ বা ওবামার মতো তিনি অন্য দেশে সামরিক হস্তক্ষেপে বিশ্বাসী নন। এমনকি ২০২৫ সালের অধিকাংশ সময় তিনি ব্যয় করেছিলেন নোবেল শান্তি পুরস্কারের দৌড়ে নিজেকে শামিল করতে। তবে ইতিহাসের পরিহাস এই যে, কয়েক মাসের ব্যবধানেই সেই ট্রাম্প ইরান আক্রমণের নির্দেশ দিয়ে নিজেকে বুশ-পরবর্তী সবচেয়ে যুদ্ধপ্রবণ প্রেসিডেন্ট হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করলেন।

এয়ারফোর্স ওয়ান থেকে যুদ্ধের দামামা

গত শুক্রবার বিকেলে যখন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’-র নির্দেশ দেন, তখন তিনি মাঝ আকাশে। টেক্সাসের কর্পাস ক্রিস্টিতে ‘যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি আধিপত্য’ বিষয়ক এক সেমিনারে যোগ দিতে যাচ্ছিলেন তিনি। উড়োজাহাজে তার সফরসঙ্গী ছিলেন কট্টরপন্থী রিপাবলিকান সিনেটর টেড ক্রুজ, জন করনিন এবং প্রবীণ অভিনেতা ডেনিস কোয়েড।

ফ্লাইটের ভেতরেই এক নাটকীয় মুহূর্ত তৈরি হয় যখন অভিনেতা কোয়েড সাবেক প্রেসিডেন্ট রোনাল্ড রেগ্যানের কণ্ঠে ট্রাম্পের প্রশংসা করেন। রেগ্যানকে রিপাবলিকানরা তাদের আদর্শিক শক্তির প্রতীক মনে করেন। কোয়েডের সেই অভিনয় যেন রেগ্যানীয় কট্টরপন্থাকে ট্রাম্পের হাতে তুলে দেওয়ার এক প্রতীকী মুহূর্ত হয়ে দাঁড়ায়। অথচ এই কোয়েডই ২০০৬ সালে বুশ প্রশাসনের ইরাক যুদ্ধের সমালোচনা করে ব্যাঙ্গাত্মক চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছিলেন।

ট্রাম্পের যুদ্ধংদেহী হওয়ার প্রধান কারণসমূহ

ট্রাম্পের এই নাটকীয় পরিবর্তনের পেছনে বেশ কিছু প্রভাবক কাজ করেছে। নিচের সারণিতে সেই ফ্যাক্টরগুলো তুলে ধরা হলো:

প্রভাবক ফ্যাক্টরট্রাম্পের ওপর এর প্রভাব
ভেনেজুয়েলা অভিযানপ্রেসিডেন্ট মাদুরোকে তুলে আনার সফল নাটকীয়তা ট্রাম্পের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়ে দেয়।
নেতানিয়াহুর প্রভাবইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী ট্রাম্পকে বোঝাতে সক্ষম হন যে ইরানে শাসন পরিবর্তন সম্ভব।
অভ্যন্তরীণ সংকটজেফরি এপস্টিন নথিতে ট্রাম্পের নাম আসায় জনমানসের মনোযোগ সরাতে যুদ্ধের পথ বেছে নেন।
সৌদি যুবরাজের চাপমোহাম্মদ বিন সালমান ব্যক্তিগতভাবে ইরানকে দমনের জন্য ট্রাম্পকে প্ররোচিত করেন।
গোয়েন্দা তথ্যসিআইএ ও মোসাদ দাবি করে যে ইরানের বর্তমান শাসকগোষ্ঠী পতনের দ্বারপ্রান্তে।

‘অপারেশন এপিক ফিউরি’: কূটনীতির ব্যর্থতা ও রণকৌশল

ট্রাম্প প্রশাসন শুরুতে দাবি করেছিল তারা কূটনৈতিক সমাধান চায়। ফেব্রুয়ারি মাসে ট্রাম্পের প্রতিনিধি স্টিভ উইটকফ এবং জ্যারেড কুশনার ওমানের মধ্যস্থতায় ইরানি কূটনীতিকদের সাথে তিন দফা বৈঠক করেন। ইরান ইউরেনিয়াম মজুত কমানোর মতো ছাড় দিতে চাইলেও ট্রাম্পের দাবি ছিল আকাশচুম্বী। তিনি চেয়েছিলেন ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবস্থা এবং পারমাণবিক সক্ষমতা চিরতরে ধ্বংস করতে।

কূটনৈতিক আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর ট্রাম্প সামরিক শক্তির পথে হাঁটেন। বুশ পরবর্তী সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে এটিই ছিল যুক্তরাষ্ট্রের বৃহত্তম সৈন্য সমাবেশ। ২৬ ফেব্রুয়ারি জেনেভার চূড়ান্ত বৈঠকে কোনো সমাধান না আসায় সামরিক হামলা অনিবার্য হয়ে পড়ে। গোয়েন্দা সংস্থাগুলো যখন নিশ্চিত করে যে ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি শনিবার সকালে তেহরানের নির্দিষ্ট কম্পাউন্ডে থাকবেন, ঠিক তখনই ট্রাম্প হামলার চূড়ান্ত আদেশে সই করেন।

মার-এ-লাগো থেকে পর্যবেক্ষণ: যুদ্ধের নতুন নিয়ন্ত্রণ কক্ষ

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প যখন কর্পাস ক্রিস্টিতে ভাষণ শেষ করে ফ্লোরিডার মার-এ-লাগো রিসোর্টে পৌঁছান, তখন সেখানে যুদ্ধ পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের জন্য একটি অস্থায়ী কক্ষ তৈরি করা হয়েছিল। এর আগে তিনি সিরিয়ায় হামলার সময়ও এই রিসোর্ট ব্যবহার করেছিলেন বলে অনেকে একে ‘ওয়ার-এ-লাগো’ বলে ডাকেন। মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ এবং সিআইএ পরিচালক জন র‍্যাটক্লিফ সেখানে উপস্থিত ছিলেন।

হামলার শুরুতে ১০০টিরও বেশি মার্কিন যুদ্ধবিমান এবং সমুদ্র থেকে টমাহক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করা হয়। ট্রাম্প এই হামলাকে ইরানি জনগণের জন্য ‘মুক্তির সুযোগ’ হিসেবে অভিহিত করেন। অথচ ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স এবং জাতীয় গোয়েন্দা পরিচালক তুলসী গ্যাবার্ড, যারা সারাজীবন বিদেশের মাটিতে শাসন পরিবর্তনের বিরোধী ছিলেন, তারাও এই যুদ্ধ পরিকল্পনায় শেষ পর্যন্ত সম্মতি প্রদান করেন।

উপসংহার: চিরন্তন যুদ্ধের আবর্তে প্রত্যাবর্তন

ডোনাল্ড ট্রাম্প তার প্রথম মেয়াদে কাসেম সোলাইমানিকে হত্যা করে এবং দ্বিতীয় মেয়াদে ভেনেজুয়েলা ও ইরানে সরাসরি হামলা চালিয়ে প্রমাণ করেছেন যে তিনি বড় আকারের স্থলযুদ্ধের বিরোধী হলেও আকাশপথে ধ্বংসলীলা চালাতে দ্বিধাবোধ করেন না। ‘শান্তির প্রেসিডেন্ট’ হওয়ার স্বপ্ন পেছনে ফেলে তিনি এখন এক অনির্দিষ্টকালের যুদ্ধের পথে পা বাড়িয়েছেন। যেখানে যুদ্ধ শুরুর ক্ষমতা প্রেসিডেন্টের হাতে থাকলেও, তা শেষ হওয়ার চাবিকাঠি এখন আর কেবল ওয়াশিংটনের হাতে নেই; বরং তেহরানের প্রতিরোধের ওপরও এটি নির্ভরশীল।