উত্তাল আরব উপসাগর: চব্বিশ ঘণ্টায় ৫ জাহাজে হামলা

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতি এখন কেবল ভূখণ্ডে সীমাবদ্ধ নেই, তা সরাসরি আছড়ে পড়েছে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রপথ আরব উপসাগরে। যুক্তরাজ্যের বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস (ইউকেএমটিও) এক উদ্বেগজনক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় এই অঞ্চলে অন্তত পাঁচটি বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার ঘটনা ঘটেছে। ইরানের পক্ষ থেকে কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালি বন্ধের ঘোষণার পর এই হামলাগুলো বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ এবং সামুদ্রিক বাণিজ্যে এক ভয়াবহ অস্থিরতা তৈরি করেছে।

হামলার বিবরণ ও ক্ষয়ক্ষতির চিত্র

ইউকেএমটিও-র তথ্য অনুযায়ী, বুধবার থেকে বৃহস্পতিবারের মধ্যে চালানো এই আক্রমণগুলোর ধরন ছিল ভিন্ন ভিন্ন। সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরাহ উপকূলে অবস্থানরত দুটি বিশালাকার তেলবাহী ট্যাংকারে শক্তিশালী ক্ষেপণাস্ত্র আঘাত হেনেছে। প্রাথমিক পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে জাহাজ দুটির ফানেল এবং বহিরাবরণের স্টিলের পাত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যদিও বড় ধরনের কোনো অগ্নিকাণ্ড বা প্রাণহানির খবর পাওয়া যায়নি, তবে এই হামলাগুলো সমুদ্রপথে যাতায়াতকারী অন্যান্য জাহাজের জন্য একটি কঠোর সতর্কবার্তা হিসেবে দেখা হচ্ছে।

এছাড়া, দুবাইয়ের পশ্চিমাঞ্চল এবং ওমান উপকূলের কাছে আরও দুটি জাহাজের অত্যন্ত নিকটবর্তী স্থানে রহস্যজনক বিস্ফোরণ ঘটেছে। কনটেইনারবাহী একটি জাহাজ হরমুজ প্রণালি অতিক্রম করার চেষ্টা করলে সেটিকে লক্ষ্য করে সরাসরি গুলিবর্ষণ ও আক্রমণ চালানো হয়। তেহরানের পক্ষ থেকে স্পষ্ট জানিয়ে দেওয়া হয়েছে যে, তাদের সমুদ্রসীমা বা হরমুজ প্রণালি ব্যবহার করে কোনো জাহাজ পার হওয়ার চেষ্টা করলে ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) এবং নৌবাহিনী সেটিকে বৈধ লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বিবেচনা করবে।


গত ২৪ ঘণ্টায় আরব উপসাগরে আক্রান্ত জাহাজের পরিসংখ্যান

জাহাজের ধরনআক্রমণের স্থানক্ষয়ক্ষতির প্রকৃতিবর্তমান অবস্থা
তেলবাহী ট্যাংকার (১)ফুজাইরাহ উপকূলক্ষেপণাস্ত্রের আঘাত, স্টিল পাত ক্ষতিগ্রস্ত।নোঙর করা অবস্থায় আছে।
তেলবাহী ট্যাংকার (২)ফুজাইরাহ উপকূলফানেল ও ইঞ্জিন রুমের উপরিভাগ ক্ষতিগ্রস্ত।মেরামতের অপেক্ষায়।
কনটেইনারবাহী জাহাজহরমুজ প্রণালিসরাসরি হামলা ও গুলিবর্ষণ।গতিপথ পরিবর্তন করেছে।
পণ্যবাহী জাহাজ (৩)ওমান উপকূলজাহাজের পাশে উচ্চমাত্রার বিস্ফোরণ।পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।
বাণিজ্যিক জাহাজ (৪)দুবাইয়ের পশ্চিমেনিকটবর্তী স্থানে ড্রোন বা মাইন বিস্ফোরণ।নিরাপদ দূরত্বে অবস্থানরত।

হরমুজ প্রণালি ও বিশ্ব অর্থনীতিতে প্রভাব

বিশ্বের মোট জ্বালানি তেলের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ এবং তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) একটি বিশাল অংশ হরমুজ প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হয়। গত সোমবার ইরান আনুষ্ঠানিকভাবে এই প্রণালি বন্ধের ঘোষণা দেওয়ার পর থেকে সেখানে এক প্রকার অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে। জ্বালানি বাজার পর্যবেক্ষণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘কেপলার’-এর তথ্যমতে, ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলি বাহিনীর সামরিক অভিযান শুরুর পর থেকে এই পথে তেলের ট্যাংকার চলাচল ৯০ শতাংশ পর্যন্ত হ্রাস পেয়েছে।

এই পরিস্থিতির ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম হু হু করে বাড়ছে। বিমা কোম্পানিগুলো এই অঞ্চলে জাহাজ চলাচলের ক্ষেত্রে ‘ওয়ার রিস্ক প্রিমিয়াম’ বা যুদ্ধকালীন ঝুঁকি বিমা কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। অনেক জাহাজ এখন হরমুজ প্রণালির পরিবর্তে আফ্রিকা মহাদেশ ঘুরে দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার কথা ভাবছে, যা বৈশ্বিক পণ্য পরিবহন খরচ বহুগুণ বাড়িয়ে দেবে।

ভবিষ্যৎ শঙ্কা ও সামরিক উত্তেজনা

বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ইরানের এই ‘শিপিং ওয়ার’ বা জাহাজ যুদ্ধ মূলত একটি সুচিন্তিত রণকৌশল। তারা প্রমাণ করতে চাইছে যে, তাদের ওপর হামলা হলে তারা বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহের মেরুদণ্ড ভেঙে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। মার্কিন নৌবাহিনীর পঞ্চম নৌবহর এই অঞ্চলে টহল দিলেও ড্রোন এবং চোরাগোপ্তা মাইন হামলা ঠেকানো তাদের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমান পরিস্থিতি বজায় থাকলে সামনের দিনগুলোতে লোহিত সাগর ও আরব উপসাগর সম্পূর্ণভাবে বাণিজ্যিক জাহাজের জন্য নিষিদ্ধ অঞ্চলে পরিণত হতে পারে।