বিশিষ্ট ব্যক্তিদের নামে ঢালাও মামলা: যাচাইয়ের নির্দেশ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর

গত ৫ আগস্টের পটপরিবর্তনের পর দেশের বিভিন্ন স্থানে বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গ ও ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে দায়ের করা ঢালাও মামলাগুলো গুরুত্বের সাথে খতিয়ে দেখার নির্দেশ দিয়েছে সরকার। সোমবার (২৩ ফেব্রুয়ারি), ২০২৬ তারিখে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত এক উচ্চপর্যায়ের সভায় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে এই নির্দেশনা প্রদান করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। মূলত নিরপরাধ ব্যক্তিরা যাতে আইনি হয়রানি বা ভোগান্তির শিকার না হন, সেটি নিশ্চিত করাই এই পদক্ষেপের প্রধান লক্ষ্য।

মামলার নেপথ্যে সুবিধাবাদী গোষ্ঠী

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন সকল অধিদপ্তর ও আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রধানদের সাথে অনুষ্ঠিত এই সমন্বয় সভায় বর্তমান দেশের সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়। সভা শেষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, ৫ আগস্টের পর থেকে দেশে অসংখ্য মামলা দায়ের করা হয়েছে। তবে উদ্বেগের বিষয় হলো, একদল সুবিধাবাদী গোষ্ঠী ব্যক্তিগত শত্রুতা বা রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের উদ্দেশ্যে সমাজের স্বনামধন্য ব্যক্তি, বড় বড় ব্যবসায়ী এবং বিশিষ্ট নাগরিকদের এসব মামলায় আসামি করেছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী স্পষ্ট করে বলেন, “এমন অনেককে আসামি করা হয়েছে, যাদের ওইসব ঘটনার সাথে জড়িত থাকার কোনো যৌক্তিক কারণ বা সম্ভাবনা নেই। অনেক বড় ব্যবসায়ী এবং সমাজের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা এই ‘মামলাবাজি’র কারণে অহেতুক ভোগান্তির শিকার হচ্ছেন। আমরা প্রশাসনকে নির্দেশ দিয়েছি এই বিষয়গুলো দ্রুত যাচাই-বাছাই করতে।”

যাচাই-বাছাইয়ের প্রক্রিয়া ও সময়সীমা

ঢালাওভাবে করা এসব মামলা পরীক্ষা করার জন্য আলাদা কোনো বিশেষ কমিটি গঠনের প্রয়োজন নেই বলে মনে করেন মন্ত্রী। তিনি জানান, এটি পুলিশের নিয়মিত কাজের অংশ এবং পুলিশই প্রাথমিক তদন্তের মাধ্যমে মামলার সত্যতা যাচাই করবে। যদিও কোনো সুনির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেওয়া হয়নি, তবে পুলিশকে অতি দ্রুত একটি প্রাথমিক রিপোর্ট জমা দিতে বলা হয়েছে।

নিচে মামলার ধরণ ও সরকারের নির্দেশনার একটি সারসংক্ষেপ প্রদান করা হলো:

লক্ষ্যভুক্ত গোষ্ঠীমামলার ধরণ ও অভিযোগসরকারের গৃহীত নির্দেশনা
বড় ব্যবসায়ীঅর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড ব্যাহত করার উদ্দেশ্যে হয়রানি।প্রাথমিক তথ্য যাচাই ছাড়া গ্রেফতার না করা।
স্বনামধন্য ব্যক্তিসামাজিক মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করার লক্ষে ঢালাও মামলা।ঘটনার সাথে সংশ্লিষ্টতা পরীক্ষা করা।
সাংবাদিক ও বুদ্ধিজীবীমতপ্রকাশের স্বাধীনতার ওপর আঘাত বা অহেতুক আসামি।আইনের শাসন নিশ্চিত করা ও ন্যায়বিচার প্রদান।
সাধারণ নাগরিকএলাকাভিত্তিক দলাদলি বা পূর্ব শত্রুতা।তদন্তে নির্দোষ প্রমাণিত হলে নাম প্রত্যাহার।

আইনের শাসন ও সুশাসন প্রতিষ্ঠা

সরকারের মূল লক্ষ্য দেশে সুশাসন এবং আইনের শাসন কায়েম করা। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদের মতে, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেওয়ার পর যদি নিরপরাধ মানুষ মামলার জাঁতাকলে পিষ্ট হয়, তবে সেই ঘোষণা প্রশ্নবিদ্ধ হয়। তিনি বলেন, “আমরা ঘোষণা দিয়েছি আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করব। কিন্তু নিরীহ মানুষ যদি মামলাবাজির শিকার হয়, তবে সেটি সুশাসনের পরিপন্থী। তাই এখন থেকে পুলিশ প্রতিটি মামলা অত্যন্ত সতর্কতার সাথে দেখবে যাতে প্রকৃত অপরাধী ছাড়া অন্য কেউ হয়রানির শিকার না হয়।”

সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি অত্যন্ত মানবিক ও পেশাদার উত্তর দেন। তিনি বলেন, “সাংবাদিকরা কি মানুষ না? তারা অবশ্যই মানুষ এবং দেশের আইন অনুযায়ী সমান সুযোগ ও ন্যায়বিচার পাওয়ার অধিকার তাদের রয়েছে। এখানে পেশা নির্বিশেষে সকল নিরপরাধ মানুষকে সুরক্ষা দেওয়া হবে।”

পুলিশের ভূমিকা ও ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা

আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে যাতে তারা কোনো অভিযোগ পাওয়ামাত্রই হুটহাট ব্যবস্থা না নিয়ে আগে প্রাথমিক তদন্ত সম্পন্ন করে। বিশেষ করে বড় মাপের শিল্পপতি বা বিনিয়োগকারীদের ক্ষেত্রে এই বিষয়টি বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, যাতে দেশের অর্থনীতির চাকা সচল থাকে এবং বিনিয়োগকারীরা আতঙ্কিত না হন। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর এই কঠোর অবস্থান ভবিষ্যতে মিথ্যা মামলার প্রবণতা কমিয়ে আনবে এবং বিচার বিভাগের ওপর চাপ কমাতে সহায়ক হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

পরিশেষে, বর্তমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এই বার্তা দিতে চায় যে, অপরাধীকে শাস্তি দেওয়া যেমন জরুরি, তেমনি একজন নিরপরাধ ব্যক্তিকে সুরক্ষা প্রদান করাও রাষ্ট্রের অন্যতম পবিত্র দায়িত্ব।