দক্ষিণ এশিয়ার দ্বীপরাষ্ট্র শ্রীলঙ্কা তাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে এক আমূল পরিবর্তনের সূচনা করেছে। দীর্ঘদিনের প্রথা ভেঙে এবং জনগণের তীব্র আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটিয়ে দেশটির পার্লামেন্ট সংসদ সদস্য ও তাঁদের বিধবা স্ত্রীদের জন্য বরাদ্দকৃত আজীবন পেনশন সুবিধা বাতিলের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। মঙ্গলবার (১৭ ফেব্রুয়ারি) কলম্বোর পার্লামেন্ট অধিবেশনে এই ঐতিহাসিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়। প্রেসিডেন্ট অনুরা কুমারা দিশানায়েকের নেতৃত্বাধীন বর্তমান বামপন্থী সরকার ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকেই রাষ্ট্রীয় ব্যয় সংকোচনে যে কঠোর নীতি গ্রহণ করেছে, এটি তারই একটি ধারাবাহিক অংশ।
ঐতিহাসিক পটভূমি ও সংস্কারের প্রেক্ষাপট
শ্রীলঙ্কায় ১৯৭৭ সাল থেকে চালু থাকা ৪৯ বছরের পুরোনো ‘পার্লামেন্টারি পেনশন অ্যাক্ট’ বাতিলের মাধ্যমে রাজনীতিবিদদের বিশেষ সুযোগ-সুবিধার অবসান ঘটানো হলো। ২০২২ সালের ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকটের পর সাধারণ মানুষের মধ্যে রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি যে চরম অনাস্থা তৈরি হয়েছিল, বর্তমান সরকার প্রশাসনিক সংস্কারের মাধ্যমে সেই আস্থা ফিরিয়ে আনতে সচেষ্ট। আইনমন্ত্রী হর্ষনা নানায়াক্কারা এই প্রস্তাবটি উত্থাপন করার সময় অত্যন্ত কড়া ভাষায় বলেন, বর্তমানে সংসদ সদস্যদের নৈতিক অবস্থান এবং তাঁদের কাজের মান বিবেচনা করলে সাধারণ মানুষ মনে করে না যে তাঁরা করদাতার টাকায় আজীবন পেনশন পাওয়ার যোগ্য।
সংসদীয় পেনশন সংস্কারের মূল বিষয়সমূহ একনজরে:
| প্রধান বিষয় | আগের আইন (১৯৭৭) | নতুন সিদ্ধান্ত (২০২৬) |
| ন্যূনতম মেয়াদ | মাত্র ৫ বছর সংসদ সদস্য থাকলেই যোগ্য। | কোনো পেনশন সুবিধা নেই। |
| ভাতাভোগী | সাবেক সাংসদ ও তাঁদের বিধবা স্ত্রীগণ। | সম্পূর্ণ বাতিল করা হয়েছে। |
| পাসের সমর্থন | – | ২২০ জনের মধ্যে ১৫৪ জন পক্ষে (২-তৃতীয়াংশ)। |
| মূল লক্ষ্য | সাংসদদের অবসরকালীন বিলাসিতা। | রাষ্ট্রীয় ব্যয় সংকোচন ও দুর্নীতি দমন। |
বিরোধিতা ও বিতর্ক
পেনশন বাতিলের এই সিদ্ধান্তটি নিয়ে পার্লামেন্টের ভেতর তীব্র বিতর্ক সৃষ্টি হয়। ২২০ সদস্যের এই আইনসভায় শাসক দলের দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় ১৫৪ জন সদস্য এর সপক্ষে ভোট দেন। তবে মাত্র ২ জন সদস্য সরাসরি বিপক্ষে ভোট দিলেও বিরোধী দলীয় নেতা সাজিথ প্রেমাদাসা এই সিদ্ধান্তের কড়া সমালোচনা করেছেন। তাঁর মতে, সংসদ সদস্যদের অবসরের পর ন্যূনতম সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত না করলে রাজনীতিবিদেরা অবসরকালীন জীবনের অনিশ্চয়তা কাটাতে দুর্নীতির মাধ্যমে অবৈধ সম্পদ অর্জনে প্রলুব্ধ হতে পারেন। তবে সরকার এই যুক্তি নাকচ করে দিয়ে সাধারণ মানুষের সমান অধিকার প্রতিষ্ঠার ওপর জোর দিয়েছে।
বিলাসিতা বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ
পেনশন বাতিলের পাশাপাশি শ্রীলঙ্কা সরকার সাবেক প্রেসিডেন্ট ও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের বিলাসিতা বন্ধে বেশ কিছু বৈপ্লবিক পদক্ষেপ নিয়েছে। গত সেপ্টেম্বর থেকে শুরু হওয়া এই অভিযানে সাবেক প্রেসিডেন্টদের জন্য বরাদ্দকৃত সরকারি বাংলো, শত শত ব্যক্তিগত দেহরক্ষী এবং বিলাসবহুল সরকারি গাড়িবহর প্রত্যাহার করা হয়েছে।
বিশেষ করে সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহিন্দা রাজাপাকসে এবং গোটাবায়া রাজাপাকসের আমলের বিশাল ব্যয়বহুল নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও সচিবালয় কর্মীদের সুযোগ-সুবিধা কমিয়ে আনা হয়েছে। উল্লেখ্য যে, এর আগে সাধারণ সরকারি কর্মচারীদের পেনশন পেতে যেখানে ১০ বছর চাকরি করতে হতো, সেখানে সাংসদদের জন্য মাত্র ৫ বছরের শিথিল নিয়ম ছিল, যা দীর্ঘ সময় ধরে সাধারণ জনগণের মধ্যে বৈষম্যের ক্ষোভ সৃষ্টি করে আসছিল।
বর্তমান সরকারের এই পদক্ষেপের মাধ্যমে শ্রীলঙ্কা কেবল অর্থ সাশ্রয় করছে না, বরং একটি দুর্নীতিমুক্ত ও জবাবদিহিমূলক রাজনৈতিক পরিবেশ তৈরির পথে এগিয়ে যাচ্ছে। লঙ্কান জনপদ এখন এই সংস্কারের সুফল পাওয়ার প্রতীক্ষায় প্রহর গুনছে।
