ফুটবলের মাঠে একসময় প্রতিপক্ষের গোলপোস্ট রক্ষায় অবিচল দায়িত্ব পালন করা আমিনুল হক এখন দেশের ক্রীড়াঙ্গনের সর্বোচ্চ দায়িত্বে। দীর্ঘ জল্পনা ও রাজনৈতিক ওঠানামার পর অবশেষে তিনি ‘টেকনোক্র্যাট কোটায়’ যুব ও ক্রীড়া মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন। বাংলাদেশের ইতিহাসে খেলোয়াড় থেকে মন্ত্রিসভায় যাওয়ার নজির নতুন নয়; এর আগে মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ ও আরিফ খান জয়ও খেলোয়াড় জীবন থেকে রাজনীতির আঙিনায় প্রবেশ করেছিলেন।
ভোলার সন্তান আমিনুলের বেড়ে ওঠা ঢাকার মিরপুরে। বড় ভাই মঈনুল হক তাঁর ফুটবল জীবনের প্রথম শিক্ষক। কিশোর বয়সে প্রথম প্রাপ্ত খ্যাপের ১৫০ টাকা মায়ের হাতে তুলে দেওয়ার মুহূর্তটি আমিনুলের জন্য ছিল অনুপ্রেরণার প্রাথমিক ঠিকানা। পাইওনিয়ার লিগের এমএসপিসি সিটি ক্লাব থেকে তাঁর হাতেখড়ি শুরু হয়। নব্বইয়ের দশকে ঢাকার পাইওনিয়ার লিগে প্রথম ৯ ম্যাচে কোনো গোল হজম না করে তিনি সকলকে অবাক করেছিলেন।
এরপর প্রথম বিভাগে ইস্ট এন্ড ক্লাব থেকে মোহামেডান স্পোর্টিং ক্লাবে যোগদান। প্রথম দুই বছরে তিনি তৃতীয় গোলরক্ষক হিসেবে ছিলেন, কিন্তু ১৯৯৬ সালে ফরাশগঞ্জ এসসি তে নাম লেখানোর পরই তিনি দলের প্রথম পছন্দের গোলরক্ষক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন।
| বছর | ক্লাব | গুরুত্বপূর্ণ অর্জন |
|---|---|---|
| 1996 | ফরাশগঞ্জ এসসি | লিগে ষষ্ঠ স্থান, ড্র বনাম আবাহনী ও মোহামেডান |
| 1997-2013 | মুক্তিযোদ্ধা সংসদ ক্রীড়া চক্র | অসংখ্য ট্রফি, দলের স্থায়ী গোলরক্ষক |
| 2009 | মোহামেডান | প্রথম সুপার কাপ জয়, সেরা গোলরক্ষক |
| 2010 | বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-২৩ | এসএ গেমস সোনা, পুরো টুর্নামেন্টে শূন্য গোল |
জাতীয় দলের অভিষেক ঘটে ১৯৯৮ সালে কাতারের বিপক্ষে। ২০০৩ সালের সাফ চ্যাম্পিয়নশিপ-এ মালদ্বীপের বিপক্ষে টাইব্রেকারে তাঁর রুখে দেওয়া শট দেশের গ্যালারিকে উল্লসিত করেছিল। ২০১০ সালের এসএ গেমস-এ বাংলাদেশ অনূর্ধ্ব-২৩ দল তাঁর নেতৃত্বে সোনা জিতেছিল। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ২০০১ সালের বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে ভিয়েতনাম ও মঙ্গোলিয়ার বিপক্ষে তার অবদান বিশেষভাবে প্রশংসিত হয়েছিল।
আমিনুলের ক্যারিয়ারের স্মরণীয় এক অধ্যায় ছিল ঢাকার ক্লাববদল। ২০০৩ সালে আবাহনী ও মুক্তিযোদ্ধা দলের মধ্যে সংঘর্ষে তাঁকে ১২ দিন লুকিয়ে রাখার ঘটনা ঘটেছিল। পুলিশি অভিযানেও তাঁকে উদ্ধার করা যায়নি, পরে নিজে পালিয়ে মুক্তিযোদ্ধা সংসদে উপস্থিত হন।
মাঠে যেমন কোনো বলকে জালে ঢুকতে দেননি, রাজনীতিতেও ক্রীড়াঙ্গনের ‘গোলপোস্ট’ রক্ষায় এখন একই মনোভাব রাখবেন—এটাই প্রত্যাশা ক্রীড়াপ্রেমীদের। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-১৬ আসনে হারের সাময়িক ধাক্কার পরও তাঁর ক্রীড়া দক্ষতা ও রাজনৈতিক ত্যাগ নতুন সরকারের চোখে পড়ে, এবং তাঁকে যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব দেওয়া হয়।
আমিনুল হক শুধু দেশের গোলরক্ষকই নন; তিনি দেশের ক্রীড়াঙ্গনের নতুন ‘ক্যাপ্টেন’, যিনি মাঠের সততা ও নীতি ক্রীড়াঙ্গনের নীতিতেও বজায় রাখবেন।
