বগুড়ায় তিন দিনে তিন হত্যা

উত্তরাঞ্চলের জেলা বগুড়ায় টানা তিন দিনে তিনটি পৃথক হত্যাকাণ্ডে জনমনে গভীর উদ্বেগ ও আতঙ্কের সৃষ্টি হয়েছে। শহর ও উপজেলার বিভিন্ন স্থানে সংঘটিত এসব ঘটনায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। তিনটি হত্যার কোনোটিরই এখনো পূর্ণাঙ্গ রহস্য উদ্ঘাটিত হয়নি, ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতার অনুভূতি বাড়ছে।

পরিবহন ব্যবসায়ীকে গলাকেটে হত্যা

সর্বশেষ ঘটনাটি ঘটে গাবতলী উপজেলার সোন্দাবাড়ী পূর্বপাড়া এলাকায়। শনিবার (১৪ ফেব্রুয়ারি) গভীর রাতে সাইফুল ইসলাম (৪০) নামে এক পরিবহন ব্যবসায়ীর গলাকাটা মরদেহ নিজ বাড়ির পাশের একটি ঘাসজমি থেকে উদ্ধার করা হয়। তিনি স্থানীয় বাসিন্দা জামাল উদ্দিন জামুর ছেলে।

পারিবারিক সূত্র জানায়, সাইফুল ইসলাম একসময় ট্রাকচালক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। পরবর্তীতে নিজ উদ্যোগে পরিবহন ব্যবসা গড়ে তুলে বর্তমানে সাতটি ট্রাকের মালিক হন। প্রতিদিন কাজ শেষে গভীর রাতে বাড়ি ফেরা ছিল তার নিয়মিত অভ্যাস। তবে শনিবার রাতে বাড়ি না ফেরায় পরিবারের সদস্যরা উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। একাধিকবার তার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সেটি বন্ধ পাওয়া যায়। পরদিন সকালে বাড়ির উত্তর পাশে একটি জমিতে তার রক্তাক্ত মরদেহ দেখতে পান স্বজনরা।

গাবতলী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আনিসুর রহমান জানান, মরদেহে গলা, মাথা ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে ধারালো অস্ত্রের একাধিক আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম) মোহাম্মদ রায়হান বলেন, প্রাথমিকভাবে ব্যবসায়িক বিরোধকে সম্ভাব্য কারণ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে, তবে ব্যক্তিগত শত্রুতা বা অন্যান্য কারণও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটনে একাধিক তদন্ত টিম কাজ করছে।

কিশোর মেকানিক ও ঢালাই শ্রমিক খুন

এর একদিন আগে শুক্রবার সকালে শহরের নিশিন্দারা ট্যাঙ্ক সাঁকো এলাকায় বাবার গ্যারেজে কিশোর মেকানিক আলিফ শাহ (১৬) খুন হন। তার গলা ও শরীরে ১১টি ধারালো অস্ত্রের আঘাত পাওয়া যায়। নিহতের বাবা রিপন শাহ সদর থানায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করেছেন। তবে এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত কাউকে গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি।

একই দিনে শনিবার সকাল ৯টার দিকে সদর উপজেলা পরিষদের সামনে মাটিডালি বিমান মোড়ে ঢালাই শ্রমিক ফাহিম হোসেন (১৯) ছুরিকাঘাতে নিহত হন। পরিবারের দাবি, বড় বোনকে উত্ত্যক্তের প্রতিবাদ করায় তাকে লক্ষ্য করে হামলা চালানো হয়। তিনি পৌর ছাত্রদলের ১৭ নম্বর ওয়ার্ড শাখার সদস্য ছিলেন। তদন্ত কর্মকর্তা মাহফুজ আলম জানিয়েছেন, ঘটনায় জড়িত সন্দেহে তনয় (১৯)সহ অন্যদের গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

তিন দিনের হত্যাকাণ্ডের সারসংক্ষেপ

তারিখনিহতের নামবয়সস্থানসম্ভাব্য কারণঅগ্রগতি
১৪ ফেব্রুয়ারিসাইফুল ইসলাম৪০সোন্দাবাড়ী, গাবতলীব্যবসায়িক বিরোধ (প্রাথমিক ধারণা)তদন্ত চলমান
১৩ ফেব্রুয়ারিআলিফ শাহ১৬নিশিন্দারা, শহর এলাকাঅজ্ঞাতমামলা দায়ের, গ্রেপ্তার হয়নি
১৪ ফেব্রুয়ারিফাহিম হোসেন১৯মাটিডালি, সদর উপজেলাউত্ত্যক্তের প্রতিবাদআসামি ধরতে অভিযান

জনমনে উৎকণ্ঠা

পরপর তিনটি হত্যাকাণ্ডে স্থানীয়দের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতার বোধ তীব্র হয়েছে। ব্যবসায়ী, শ্রমজীবী ও সাধারণ মানুষ দ্রুত অপরাধীদের গ্রেপ্তার এবং ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটনের দাবি জানিয়েছেন। সচেতন মহলের মতে, কার্যকর তদন্ত ও দৃশ্যমান আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে জনমনে আস্থা ফিরিয়ে আনা এখন সময়ের দাবি।