হালদা নদী রক্ষায় মানিকছড়ি অংশে তামাক চাষ বন্ধ

দেশের একমাত্র প্রাকৃতিক মৎস্য প্রজননক্ষেত্র এবং এশিয়ার বৃহত্তম কার্পজাতীয় মাছের বিচরণস্থল হালদা নদীকে দূষণমুক্ত রাখতে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়েছে। হালদা নদীর উৎস ও অববাহিকার গুরুত্বপূর্ণ অংশ খাগড়াছড়ির মানিকছড়ি উপজেলায় চলতি বছর তামাক চাষ সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করা সম্ভব হয়েছে। সরকারের এই কঠোর এবং সময়োপযোগী সিদ্ধান্তের ফলে নদীটির জীববৈচিত্র্য ও পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষার ক্ষেত্রে এক নতুন আশার আলো দেখা দিয়েছে।

সরকারি উদ্যোগ ও সমন্বিত প্রচেষ্টা

গত সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৬) মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে প্রকাশিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এই সাফল্যের কথা জানানো হয়। গত বছরও মানিকছড়ি অংশে ১১ জন চাষি প্রায় ২০ একর জমিতে তামাক চাষ করেছিলেন। তবে এ বছর জেলা ও উপজেলা প্রশাসন এবং মৎস্য অধিদপ্তরের নিরলস পরিশ্রমে তামাক চাষ শূন্যের কোঠায় নামিয়ে আনা হয়েছে। মূলত ৫ নভেম্বর ২০২৫ তারিখে জারি করা সংশোধিত গেজেটের মাধ্যমে হালদা অববাহিকায় তামাক চাষ নিষিদ্ধ ঘোষণা করার পর থেকেই মাঠ পর্যায়ে কাজ শুরু হয়।

পরিবেশের ওপর ইতিবাচক প্রভাব

বিশেষজ্ঞদের মতে, হালদা নদীর পানি দূষণের অন্যতম প্রধান উৎস ছিল তামাক চাষে ব্যবহৃত বিষাক্ত কীটনাশক ও সার। বৃষ্টির পানিতে ধুয়ে এই ক্ষতিকর রাসায়নিকগুলো সরাসরি নদীতে মিশে মাছের প্রজনন ক্ষমতা ও পোনার ক্ষতি করত। তামাক চাষ বন্ধ হওয়ায় হালদার মা মাছের নিরাপদ বিচরণ নিশ্চিত হবে।

হালদা অববাহিকায় তামাক চাষ বন্ধের কার্যক্রম এক নজরে:

ক্রমকার্যক্রমের বিবরণবাস্তবায়নকারী সংস্থা
তামাক চাষ নিষিদ্ধ করে প্রজ্ঞাপন জারিমৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়
মাঠ পর্যায়ে মনিটরিং ও প্রচারণামানিকছড়ি উপজেলা মৎস্য দপ্তর
তামাক চাষিদের সঙ্গে সরাসরি বৈঠকউপজেলা প্রশাসন ও কৃষি অধিদপ্তর
বিকল্প ফসল চাষে উৎসাহ প্রদানকৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর
নিয়মিত নজরদারি ও আইনি প্রয়োগজেলা আইন-শৃঙ্খলা কমিটি ও টাস্কফোর্স

কৃষকদের জন্য বিকল্প ফসলের সংস্থান

ডিসেম্বর ও জানুয়ারি মাসে তামাকের চারা রোপণের সময় হলেও মানিকছড়ি উপজেলা প্রশাসন এবং কৃষি বিভাগ চাষিদের সঙ্গে দফায় দফায় আলোচনা করে তাদের সরকারি নিষেধাজ্ঞার কথা জানিয়েছে। তামাক চাষের পরিবর্তে কৃষকদের ক্ষতি পোষাতে সরিষা, ভুট্টা এবং বিভিন্ন ধরনের সবজি চাষে উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। এর ফলে কৃষকরা যেমন তামাকের মরণনেশা থেকে মুক্তি পাচ্ছেন, তেমনি নদীর প্রাকৃতিক পরিবেশও সুরক্ষিত হচ্ছে।

ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা ও মনিটরিং

মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ফরিদা আখতার এই কার্যক্রমের প্রশংসা করেছেন। তিনি ভবিষ্যতে যাতে কোনোভাবেই তামাক চাষ পুনরায় শুরু হতে না পারে, সে জন্য নিয়মিত মনিটরিং জোরদার করার নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, হালদা নদীর মৎস্য হেরিটেজ রক্ষা করা আমাদের জাতীয় দায়িত্ব। তামাক চাষ বন্ধের পাশাপাশি নদী থেকে অবৈধ বালু উত্তোলন এবং ইঞ্জিনচালিত নৌকা চলাচল বন্ধেও জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করা হয়েছে।

হালদা অববাহিকার এই সফলতা যদি দীর্ঘমেয়াদে বজায় রাখা যায়, তবে তা বাংলাদেশের মৎস্যসম্পদ এবং পরিবেশ সংরক্ষণের ইতিহাসে একটি মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হবে।