অবনমনের শঙ্কায় বার্নলি: প্রিমিয়ার লিগ বনাম চ্যাম্পিয়নশিপের টানাপোড়েন

ইংলিশ প্রিমিয়ার লিগের পয়েন্ট টেবিলের তলানির দিকে তাকালে এখন কেবল একটিই দীর্ঘশ্বাস শোনা যায়—সেটি বার্নলি ফুটবল ক্লাবের। গত মৌসুমে বিপুল বিক্রমে চ্যাম্পিয়নশিপ জয় করে প্রিমিয়ার লিগে ফিরলেও, এক বছরের মাথায় আবারও অবনমনের (Relegation) দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়ে আছে ‘ক্ল্যারেটস’রা। ২৪ ম্যাচে মাত্র ৩টি জয় আর ১১ পয়েন্টের বিশাল ব্যবধানে পিছিয়ে থাকা বার্নলির জন্য প্রিমিয়ার লিগে টিকে থাকা এখন অলৌকিক কোনো ঘটনার চেয়ে কম কিছু নয়। আগামী শনিবার ঘরের মাঠ টার্ফ মুরে ওয়েস্ট হ্যামের বিপক্ষে ম্যাচটি তাদের জন্য কার্যত ‘বাঁচা-মরার’ লড়াই।

মাঠের পারফরম্যান্স ও সমর্থকদের মনস্তত্ত্ব

টানা ১৫টি ম্যাচে জয়ের মুখ না দেখা বার্নলির সমর্থকরা এখন হারের গ্লানি সহ্য করতে করতে এক ধরনের উদাসীনতায় আক্রান্ত। সিজন টিকিট হোল্ডার মার্ক বেন্টলি যেমনটি বলছিলেন, “আমি এখন মাঠে যাওয়াটা উপভোগ করি, কিন্তু ফলাফল আমাকে আর আগের মতো ভাবায় না।” প্রিমিয়ার লিগের শক্তিশালী দলগুলোর সাথে লড়াই করার যে আনন্দ থাকার কথা ছিল, বার্নলির ক্ষেত্রে তা পরিণত হয়েছে দুঃস্বপ্নে। বর্তমান কোচ স্কট পার্কারের রক্ষণাত্মক কৌশল সমর্থকদের মনে একঘেয়েমি তৈরি করেছে। যেখানে গত মৌসুমে ভিনসেন্ট কোম্পানির অধীনে দলটি ১০০ পয়েন্ট নিয়ে আক্রমণাত্মক ফুটবল খেলেছিল, সেখানে পার্কারের অধীনে দলটি এখন গোলপোস্টে শট নিতেও হিমশিম খাচ্ছে।

নিচে প্রিমিয়ার লিগের বর্তমান রেলিগেশন জোনের পয়েন্ট টেবিল দেওয়া হলো:

অবস্থানদলম্যাচগোল ব্যবধানপয়েন্ট
১৬লিডস ইউনাইটেড২৪-১১২৬
১৭নটিংহ্যাম ফরেস্ট২৪-১১২৬
১৮ওয়েস্ট হ্যাম২৪-১৯২০
১৯বার্নলি২৪-২২১৫
২০উলভারহ্যাম্পটন২৪-৩০

কেন এই বিপর্যয়? দলবদল ও কৌশলগত ব্যর্থতা

গ্রীষ্মকালীন দলবদলে ম্যানচেস্টার সিটির অভিজ্ঞ ডিফেন্ডার কাইল ওয়াকারকে দলে ভিড়িয়ে চমক দিয়েছিল বার্নলি। কিন্তু স্কোয়াডের গভীরতা এবং প্রিমিয়ার লিগের মানের স্ট্রাইকারের অভাব দলটিকে ভুগিয়েছে। জানুয়ারি উইন্ডোতে কেবল জেমস ওয়ার্ড-প্রাউজকে ধারে নিয়ে আসা ছাড়া উল্লেখযোগ্য কোনো পরিবর্তন দেখা যায়নি। দলের দুই সর্বোচ্চ গোলদাতা জেইডন অ্যান্থনি এবং জিয়ান ফ্লেমিং—উভয়েই মাত্র ৫টি করে গোল করেছেন, যা প্রিমিয়ার লিগের মতো প্রতিযোগিতামূলক আসরে টিকে থাকার জন্য মোটেও যথেষ্ট নয়।

শন ডাইচ বনাম স্কট পার্কার: হারানো ঐতিহ্যের সন্ধানে

টার্ফ মুরের পুরনো সমর্থকরা এখনো শন ডাইচ যুগের কথা স্মরণ করে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়েন। ডাইচের অধীনে বার্নলি টানা পাঁচ মৌসুম প্রিমিয়ার লিগে দাপটের সাথে টিকে ছিল এবং এমনকি ইউরোপীয় প্রতিযোগিতায় খেলার যোগ্যতা অর্জন করেছিল। তখন টার্ফ মুরে ম্যানচেস্টার ইউনাইটেড বা লিভারপুলের মতো জায়ান্টদের হারিয়ে দেওয়াটা ছিল নিয়মিত ঘটনা। বর্তমানে সেই লড়াকু মানসিকতা এবং ক্লাবের স্বতন্ত্র পরিচয় অনেকটাই ফিকে হয়ে গেছে। সমর্থকদের একটি বড় অংশ এখন প্রকাশ্যেই পার্কারের বিদায় দাবি করছেন; এমনকি ট্রেনিং গ্রাউন্ডের সামনে ‘পার্কার আউট’ পোস্টারও দেখা গেছে।

চ্যাম্পিয়নশিপে ফেরার ইতিবাচকতা

অদ্ভুত শোনালেও সত্যি যে, অনেক বার্নলি ভক্ত দ্বিতীয় স্তরের লিগ অর্থাৎ চ্যাম্পিয়নশিপে ফিরে যাওয়াকেই এখন মন্দের ভালো মনে করছেন। তাঁদের মতে, প্রিমিয়ার লিগে প্রতি সপ্তাহে বিধ্বস্ত হওয়ার চেয়ে চ্যাম্পিয়নশিপে নিয়মিত জয় পাওয়া এবং জেতার আনন্দ উদযাপন করা অনেক বেশি তৃপ্তিদায়ক। প‍্যাডি নামের এক সমর্থক যেমনটি বললেন, “ছোট্ট শহর বার্নলির মানুষ হয়ে বিশ্বের সেরা লিগে খেলার গৌরব আমাদের আছে, এটাই বড় কথা। তবে চ্যাম্পিয়নশিপে আমরা অন্তত ম্যাচগুলো উপভোগ করি, সেখানে লড়াইটা সমানে সমান হয়।”

ভবিষ্যৎ সমীকরণ

শনিবার ওয়েস্ট হ্যামের বিপক্ষে হারলে বার্নলির অবনমন প্রায় নিশ্চিত হয়ে যাবে। সেক্ষেত্রে পরবর্তী মৌসুমে আবারও ৪৬ ম্যাচের দীর্ঘ ও ক্লান্তিকর চ্যাম্পিয়নশিপের পথে যাত্রা শুরু করতে হবে তাদের। তবে সমর্থকদের কাছে বড় স্বস্তি হলো, প্রিমিয়ার লিগের ইতিহাসে সর্বনিম্ন পয়েন্ট পাওয়ার রেকর্ডটি অন্তত তাদের নামের পাশে জুটছে না। এখন তাদের একমাত্র লক্ষ্য অন্তত টেবিলের তলানি থেকে এক ধাপ উপরে থেকে মৌসুম শেষ করা।