বাংলাদেশের রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের বোঝা কমানোর যে ব্যাপক প্রচেষ্টা চলছে, তাতে বড় ধরনের সাফল্যের মুখ দেখেছে অগ্রণী ব্যাংক পিএলসি। ২০২৫ সালের বার্ষিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ব্যাংকটি তাদের খেলাপি ঋণের পরিমাণ আগের বছরের তুলনায় ৩,৫৮৪ কোটি টাকা কমিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে। এই ইতিবাচক পরিবর্তন ব্যাংকটির আর্থিক ভিত্তি শক্তিশালী করার পাশাপাশি রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর প্রতি আমানতকারীদের আস্থা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
Table of Contents
খেলাপি ঋণ ও আর্থিক সূচকের চিত্র
অগ্রণী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মো. আনোয়ারুল ইসলাম সম্প্রতি গণমাধ্যমকর্মীদের জানান, ২০২৪ সাল শেষে ব্যাংকের মোট খেলাপি ঋণের পরিমাণ ছিল ৩২,০০২ কোটি টাকা, যা ছিল মোট ঋণের ৪০.৪৯ শতাংশ। ব্যাংক কর্তৃপক্ষের কঠোর তদারকি এবং আদায় প্রক্রিয়ায় গতিশীলতা আনায় ২০২৫ সাল শেষে খেলাপি ঋণের পরিমাণ কমে দাঁড়িয়েছে ২৮,৬১৬ কোটি টাকায়। অর্থাৎ, এক বছরের ব্যবধানে খেলাপি ঋণের অনুপাত প্রায় ৫ শতাংশ কমে ৩৫.৫২ শতাংশে নেমে এসেছে।
ব্যাংকটির আর্থিক অবস্থার আমূল পরিবর্তনের একটি তুলনামূলক চিত্র নিচে তুলে ধরা হলো:
| সূচক (অর্থবছর অনুযায়ী) | ২০২৪ সাল (কোটি টাকা) | ২০২৫ সাল (কোটি টাকা) | পরিবর্তন/প্রবৃদ্ধি |
| মোট খেলাপি ঋণ | ৩২,০০২ | ২৮,৬১৬ | ৩,৫৮৪ কোটি (হ্রাস) |
| খেলাপি ঋণের হার | ৪০.৪৯% | ৩৫.৫২% | ৪.৯৭% (হ্রাস) |
| পরিচালন মুনাফা | ১,৫১১ | ২,৫০২ | ৯৯১ কোটি (বৃদ্ধি) |
| আমানত সংগ্রহ | ৯৯,২৩২ | ১,১৩,০৬৪ | ১৩,৮৩২ কোটি (বৃদ্ধি) |
| প্রবাসী আয় (রেমিট্যান্স) | ২১,০৩৩ | ৩৩,৯৬১ | ১২,৯২৮ কোটি (বৃদ্ধি) |
| আমদানি বাণিজ্য | ৫০,৫৮৮ | ৫৪,৩৬৭ | ৩,৭৭৯ কোটি (বৃদ্ধি) |
রেকর্ড মুনাফা ও আদায়ের কৌশল
২০২৫ সালে অগ্রণী ব্যাংক তার ইতিহাসের সর্বোচ্চ পরিচালন মুনাফা অর্জন করেছে। গত বছরে ব্যাংকটির পরিচালন মুনাফা দাঁড়িয়েছে ২,৫০২ কোটি টাকা, যা পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় ৯৯১ কোটি টাকা বেশি। এই প্রবৃদ্ধির নেপথ্যে ছিল খেলাপি ঋণ আদায়ের অভূতপূর্ব সাফল্য। ২০২৪ সালে যেখানে মাত্র ১,৭২৬ কোটি টাকা খেলাপি ঋণ আদায় হয়েছিল, সেখানে ২০২৫ সালে আদায়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১০,২৩৪ কোটি টাকা।
আদায়ের এই বিশাল অংকের ব্যবচ্ছেদ করলে দেখা যায়, নগদ আদায় হয়েছে ১,০০৯ কোটি টাকা, পুনঃতফসিলীকরণের (Rescheduling) মাধ্যমে এসেছে ৮,৩৬৮ কোটি টাকা এবং অবলোপনকৃত (Written-off) ঋণ থেকে আদায় হয়েছে ৯৩৬ কোটি টাকা। ব্যাংক এমডির মতে, এই সাফল্যের ধারাবাহিকতায় ২০২৬ সালের মধ্যে খেলাপি ঋণের হার ২০ শতাংশের নিচে নামিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে।
রেমিট্যান্স ও বৈদেশিক বাণিজ্যে অবস্থান
২০২৫ সালে অগ্রণী ব্যাংকের মাধ্যমে প্রবাসী আয় বা রেমিট্যান্স আসার পরিমাণও উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। এক বছরে ১২,৯২৮ কোটি টাকা বেশি রেমিট্যান্স সংগ্রহ করে ব্যাংকটি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে। আমদানি বাণিজ্যে ব্যাংকটি ইতিবাচক অবস্থানে থাকলেও রপ্তানি বাণিজ্যে কিছুটা ভাটা লক্ষ্য করা গেছে। ২০২৪ সালের তুলনায় ২০২৫ সালে রপ্তানি আয় ৮৬২ কোটি টাকা কমে ১৩,২৫২ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আনোয়ারুল ইসলাম আশাবাদ ব্যক্ত করেন যে, ২০২৬ সালে তারা ১২,২০০ কোটি টাকা ঋণ আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে সক্ষম হবেন। ডিজিটাল ব্যাংকিং সেবার প্রসার, গ্রাহক সেবার মানোন্নয়ন এবং খেলাপি ঋণ আদায়ে জিরো টলারেন্স নীতি বজায় রাখাই এখন অগ্রণী ব্যাংকের মূল কৌশল। রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর প্রতি যে নেতিবাচক ধারণা প্রচলিত ছিল, অগ্রণী ব্যাংকের এই সংস্কারমুখী অগ্রযাত্রা সেই ধারণা বদলে দিতে সাহায্য করবে।
