আটলান্টিক মহাসাগরের দুই পাড়ে বর্তমানে জেফরি এপস্টেইন নামক এক অভিশপ্ত নামকে কেন্দ্র করে বইছে প্রচণ্ড রাজনৈতিক ঝড়। তবে এই ঝড়ের প্রভাব লন্ডন এবং ওয়াশিংটনে সম্পূর্ণ ভিন্ন রূপ পরিগ্রহ করেছে। জেফরি এপস্টেইনের যৌন কেলেঙ্কারি ও পাচারকৃত নথির বিষাক্ত থাবায় যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ যখন খাদের কিনারায়, তখন একই নথিতে নাম থাকা সত্ত্বেও মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প অবস্থান করছেন বেশ সুবিধাজনক ও নির্বিকার অবস্থানে। এই বৈপরীত্য মূলত স্টারমারের নেতৃত্বের ভঙ্গুরতা এবং ট্রাম্পের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণেরই এক নগ্ন বহিঃপ্রকাশ।
লন্ডনে রাজনৈতিক ভূমিকম্প ও স্টারমারের অসহায়ত্ব
যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের সরাসরি কোনো যোগসূত্র এপস্টেইনের সাথে না থাকলেও, তাঁর ক্যাবিনেটের প্রভাবশালী সদস্য পিটার ম্যান্ডেলসনের এপস্টেইন-সখ্য এখন স্টারমারের গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। গত বৃহস্পতিবার পার্লামেন্টে স্টারমারের ক্ষমা প্রার্থনা এবং তাঁর দলের ভেতরে দানা বাঁধা বিদ্রোহ ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিটকে দিশাহারা করে তুলেছে। বিশেষভাবে প্রশ্ন উঠেছে, এপস্টেইনের সাথে ম্যান্ডেলসনের অন্ধকার সম্পর্কের কথা জেনেও কেন তাঁকে ওয়াশিংটনে রাষ্ট্রদূত করার মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো?
ফাঁস হওয়া নতুন তথ্যে দেখা গেছে, ম্যান্ডেলসন কেবল ব্যক্তিগত সখ্যই রাখেননি, বরং ২০০৮ সালের বিশ্বমন্দার সময় স্পর্শকাতর রাষ্ট্রীয় ও বাজার নিয়ন্ত্রণকারী তথ্য এপস্টেইনকে পাচার করেছিলেন। এই অভিযোগে ম্যান্ডেলসন পদত্যাগ করলেও এর দায়ভার এখন সরাসরি স্টারমারের নেতৃত্বের ওপর বর্তাচ্ছে।
যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক পরিস্থিতির তুলনামূলক চিত্র:
| সূচক (Criteria) | যুক্তরাজ্য (কিয়ার স্টারমার) | যুক্তরাষ্ট্র (ডোনাল্ড ট্রাম্প) |
| রাজনৈতিক জবাবদিহি | পার্লামেন্টের তীব্র প্রশ্নবাণ ও দলের অভ্যন্তরে বিদ্রোহ। | রিপাবলিকান নিয়ন্ত্রিত কংগ্রেস ও বিচার বিভাগের সুরক্ষা। |
| নথির প্রভাব | ক্যাবিনেট মন্ত্রীর পদত্যাগ ও প্রধানমন্ত্রীর গদি টালমাটাল। | নথিতে নাম থাকলেও প্রশাসনিক শক্তিতে কোনো ফাটল নেই। |
| তদন্তের গতি | ফৌজদারি তদন্ত ও রাজপরিবারের অস্বস্তি বৃদ্ধি। | তদন্ত প্রক্রিয়া রাজনৈতিক প্রভাবে ধীর ও সীমিত। |
| নেতৃত্বের মেয়াদ | সংসদীয় ব্যবস্থায় যেকোনো সময় পতনের শঙ্কা। | প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্দিষ্ট মেয়াদে সুরক্ষিত অবস্থান। |
ব্রিটিশ রাজনীতির ত্রিমুখী সংকট
এপস্টেইন-কাণ্ড যুক্তরাজ্যের রাজনীতিতে তিনটি বড় ক্ষতকে নতুন করে উসকে দিয়েছে:
১. নেতৃত্বের সংকট: নিরঙ্কুশ জয়ের মাত্র দুই বছরের মাথায় স্টারমারের ব্যক্তিগত ভাবমূর্তি ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।
২. ম্যান্ডেলসন অধ্যায়: ‘প্রিন্স অব ডার্কনেস’ খ্যাত পিটার ম্যান্ডেলসনের পতন লেবার পার্টির জন্য এক বিরাট নৈতিক পরাজয়।
৩. রাজপরিবারের অস্বস্তি: প্রিন্স অ্যান্ড্রুর পর এই নথিতে রাজপরিবার সংশ্লিষ্ট আরও তথ্যের সম্ভাবনা উইন্ডসর ক্যাসেলকে নতুন অস্তিত্বের সংকটে ফেলেছে।
ওয়াশিংটনের প্রেক্ষাপট: ট্রাম্পের অভেদ্য দুর্গ
স্টারমার যখন অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে লড়ছেন, ট্রাম্প তখন প্রায় নির্বিকার। মার্কিন বিচার বিভাগ এবং রিপাবলিকান নিয়ন্ত্রিত কংগ্রেস ট্রাম্পের চারপাশে এক ধরণের সুরক্ষাবলয় তৈরি করে রেখেছে। মজার বিষয় হলো, ট্রাম্প ক্লিনটন দম্পতির সাক্ষ্য দেওয়ার বিষয়ে ‘সহমর্মিতা’ প্রকাশ করে বিষয়টিকে অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেওয়ার রাজনৈতিক চাল চেলেছেন। ট্রাম্পের এই কৌশল পরিষ্কার করে যে, তিনি এপস্টেইন নথির উত্তাপকে নিজের গদি পাকাপোক্ত করার অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করতে জানেন।
উপসংহার
সাত বছর আগে কারাকক্ষে এপস্টেইনের মৃত্যু হলেও তাঁর রেখে যাওয়া ‘প্যান্ডোরা বক্স’ এখনো বিশ্ব রাজনীতির রাঘববোয়ালদের ঘুম কেড়ে নিচ্ছে। নরওয়ে থেকে পোল্যান্ড পর্যন্ত বিস্তৃত এই কেলেঙ্কারির উত্তাপ এখন সবচেয়ে বেশি টের পাচ্ছেন কিয়ার স্টারমার। যুক্তরাজ্যের স্বচ্ছ রাজনৈতিক সংস্কৃতি যেখানে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে সক্রিয়, সেখানে যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতা কেন্দ্রিক মেরুকরণ সত্যকে আড়াল করার সুযোগ করে দিচ্ছে। শেষ পর্যন্ত এই এপস্টেইন-ঝড় স্টারমারকে ক্ষমতাচ্যুত করবে নাকি তিনি এই বৈতরণী পার হতে পারবেন, তা সময়ই বলে দেবে।









