বাংলাদেশে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন সম্প্রতি তাঁর স্ত্রী ডিয়ানকে সঙ্গে নিয়ে পুরান ঢাকার ঐতিহাসিক স্থাপত্য, প্রাণবন্ত সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যবাহী খাবারের স্বাদ গ্রহণ করেছেন। প্রাচীন ঐতিহ্য, মুঘল স্থাপত্যের সৌন্দর্য এবং ঢাকাইয়া আতিথেয়তার আন্তরিকতায় মুগ্ধতা প্রকাশ করেন এই মার্কিন দম্পতি।
ঢাকার মার্কিন দূতাবাস সূত্রে জানা যায়, বৃহস্পতিবার (৫ ফেব্রুয়ারি) অনুষ্ঠিত এই সফর শুরু হয় মুঘল স্থাপত্যের অনন্য নিদর্শন লালবাগ কেল্লা পরিদর্শনের মাধ্যমে। ১৭শ শতাব্দীতে নির্মিত এই দুর্গটি সম্রাট আওরঙ্গজেবের পুত্র শাহজাদা মুহাম্মদ আজমের উদ্যোগে ১৬৭৮ সালে নির্মাণকাজ শুরু হয়। যদিও নির্মাণ অসমাপ্ত থেকে যায়, তবু এটি ঢাকার ঐতিহাসিক স্থাপত্য ঐতিহ্যের এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
রাষ্ট্রদূত বিশেষভাবে পরিদর্শন করেন কেল্লার হাম্মামখানা বা রাজকীয় স্নানাগার, যা সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের ‘অ্যাম্বাসেডরস ফান্ড ফর কালচারাল প্রিজারভেশন’-এর আর্থিক সহায়তায় সংস্কার ও সংরক্ষণ করা হয়েছে। এই তহবিলের মাধ্যমে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গুরুত্বপূর্ণ প্রত্নতাত্ত্বিক ও সাংস্কৃতিক নিদর্শন সংরক্ষণে সহায়তা প্রদান করা হয়। লালবাগ কেল্লার হাম্মামখানার পুনরুদ্ধার কাজকে তিনি দ্বিপাক্ষিক সাংস্কৃতিক সহযোগিতার একটি উজ্জ্বল উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেন।
রাষ্ট্রদূত তাঁর ভিডিও বার্তায় বলেন, “শুভ দিন। আমি ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন, বাংলাদেশে নিযুক্ত যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত। ২০২১ সালে আমার পূর্বসূরি রাষ্ট্রদূত আর্ল মিলার এই স্থানটিকে সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণে রাষ্ট্রদূত তহবিলের জন্য মনোনীত করেছিলেন। অসংখ্য প্রকল্পের মাঝে এটি একটি চমৎকার উদাহরণ।” তিনি সংস্কারকাজের মানের প্রশংসা করে জানান, কয়েক বছর আগের তুলনায় স্থাপনাটির বর্তমান রূপ উল্লেখযোগ্যভাবে পরিবর্তিত হয়েছে এবং পুনরায় এখানে আসতে পেরে তিনি আনন্দিত।
লালবাগ কেল্লা পরিদর্শন শেষে রাষ্ট্রদূত দম্পতি যান সপ্তদশ শতাব্দীর ঐতিহাসিক হোসেনী দালানে, যা শিয়া সম্প্রদায়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ ধর্মীয় স্থাপনা। সেখানে কিছু সময় অতিবাহিত করে তারা পুরান ঢাকার সরু অলিগলি, প্রাচীন দালানকোঠা ও ব্যস্ত জনজীবন ঘুরে দেখেন। যান্ত্রিক আধুনিকতার ভেতরেও পুরান ঢাকার ঐতিহ্যবাহী জীবনধারা তাঁকে বিশেষভাবে আকৃষ্ট করে।
সফরের অংশ হিসেবে তারা পুরান ঢাকার বিখ্যাত ঐতিহ্যবাহী খাবারের স্বাদও গ্রহণ করেন। ঢাকাই বিরিয়ানি, বাখরখানি, কাবাব ও মিষ্টান্নসহ স্থানীয় নানা পদ তাদের পরিবেশন করা হয়। মার্কিন দূতাবাসের বিবৃতিতে বলা হয়, পুরান ঢাকার সংস্কৃতি, ইতিহাস ও রন্ধন ঐতিহ্যের সঙ্গে প্রত্যক্ষ পরিচয় এই সফরকে আরও অর্থবহ করে তুলেছে।
নিম্নে সফরের উল্লেখযোগ্য স্থানসমূহের সংক্ষিপ্ত বিবরণ দেওয়া হলো:
| স্থান | নির্মাণকাল | ঐতিহাসিক গুরুত্ব | বিশেষ উল্লেখ |
|---|---|---|---|
| লালবাগ কেল্লা | ১৬৭৮ সাল | মুঘল স্থাপত্যের নিদর্শন | হাম্মামখানা সংস্কার যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তায় |
| হাম্মামখানা | ১৭শ শতাব্দী | রাজকীয় স্নানাগার | প্রত্নতাত্ত্বিক পুনরুদ্ধার প্রকল্প |
| হোসেনী দালান | ১৭শ শতাব্দী | শিয়া সম্প্রদায়ের ধর্মীয় কেন্দ্র | ঐতিহাসিক ও ধর্মীয় ঐতিহ্য |
এই সফর কেবল সৌজন্য সাক্ষাৎ নয়; বরং বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সাংস্কৃতিক সহযোগিতা ও ঐতিহ্য সংরক্ষণে পারস্পরিক অঙ্গীকারের প্রতীক হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে। পুরান ঢাকার ঐতিহাসিক স্থাপনা ও প্রাণবন্ত জনজীবন আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের একটি ইতিবাচক বার্তা বহন করে—রাষ্ট্রদূতের এই সফর সেই বার্তাকেই আরও দৃঢ় করেছে।
