খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ৩ই ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ৫:৫৭ এএম

ভারতে অবৈধভাবে বসবাসকারী অভিবাসীদের শনাক্তকরণ প্রক্রিয়া নিয়ে কয়েক মাস ধরে চলা উত্তপ্ত পরিস্থিতির মাঝে এক নতুন ও অভাবনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে মহারাষ্ট্র প্রশাসন। এবার বেআইনিভাবে বসবাসকারী বাংলাদেশি এবং রোহিঙ্গাদের চিহ্নিত করতে এআই (AI) বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রযুক্তি ব্যবহারের ঘোষণা দিয়েছেন মহারাষ্ট্রের উপ-মুখ্যমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দেভেন্দ্র ফডনবীশ। তবে এই প্রযুক্তিগত পদক্ষেপটি বৈজ্ঞানিক নির্ভুলতা এবং সম্ভাব্য মানবাধিকার লঙ্ঘনের প্রশ্নে ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।
Table of Contents
সম্প্রতি ভারতের একটি জনপ্রিয় সংবাদমাধ্যমের অনুষ্ঠানে দেভেন্দ্র ফডনবীশ প্রকাশ করেন যে, মুম্বাই প্রশাসনের পক্ষ থেকে ‘ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি’ (আইআইটি) মুম্বাইয়ের সহযোগিতায় একটি বিশেষ এআই টুল তৈরি করা হচ্ছে। মুখ্যমন্ত্রীর দাবি অনুযায়ী, বর্তমানে এই প্রযুক্তিটি ৬০ শতাংশ নির্ভুলভাবে কাজ করছে এবং আগামী চার মাসের মধ্যে এটি শতভাগ নির্ভুলভাবে অভিবাসী শনাক্ত করতে সক্ষম হবে। মূলত পুলিশি অভিযানের সময় সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের পরিচয় ও নথিপত্র যাচাইয়ের গতি বাড়াতেই এই ডিজিটাল পদ্ধতির সাহায্য নেওয়া হচ্ছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিশেষজ্ঞরা এই প্রকল্পের কার্যকারিতা নিয়ে গভীর সন্দেহ প্রকাশ করেছেন। তাঁদের মতে, এই প্রযুক্তিতে সাধারণত ‘লার্জ ল্যাঙ্গুয়েজ মডেল’ ব্যবহার করা হয়, যেখানে ব্যক্তির শারীরিক গঠন, কথা বলার ধরণ (অ্যাকসেন্ট), পোশাক এবং আচার-আচরণ সংক্রান্ত তথ্য ফিড করা থাকে।
কলকাতা ভিত্তিক এআই বিশেষজ্ঞ জয়দীপ দাশগুপ্তের মতে, যন্ত্রকে হয়তো শেখানো হবে একজন ‘টিপিক্যাল’ বাংলাদেশি মুসলমানের অবয়ব কেমন হতে পারে—যেমন তাঁর দাড়ির ধরণ বা টুপি পরার ধরণ। কিন্তু এখানেই তৈরি হচ্ছে বড় ঝুঁকি। কারণ, পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ বা মালদহের একজন ভারতীয় মুসলমানের কথা বলার ধরণ এবং পোশাকের সঙ্গে বাংলাদেশের রাজশাহী অঞ্চলের মানুষের গভীর মিল রয়েছে। একইভাবে সিলেট ও ত্রিপুরার ভাষার পার্থক্য যন্ত্রের পক্ষে আলাদা করা প্রায় অসম্ভব।
দীর্ঘদিন ধরে নাগরিকত্ব ইস্যু নিয়ে গবেষণা করা অর্থনীতিবিদ প্রসেনজিৎ বসু এই পদক্ষেপকে ‘মিথ্যাচার’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। তাঁর প্রশ্ন, ভোটার তালিকা সংশোধন বা এসআইআর (SIR)-এর মতো নিবিড় সরকারি প্রক্রিয়ায় যেখানে উল্লেখযোগ্য সংখ্যায় অনুপ্রবেশকারী পাওয়া যাচ্ছে না, সেখানে একটি যন্ত্র কীভাবে তা নির্ভুলভাবে করবে?
বিশেষজ্ঞ অরিজিৎ মুখার্জীর মতে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সবসময় তাকে দেওয়া তথ্যের (Training Data) ওপর ভিত্তি করে ফলাফল দেয়। যদি এই তথ্যের মধ্যে কোনো রাজনৈতিক পক্ষপাত থাকে, তবে এর ফলাফলও পক্ষপাতদুষ্ট হবে। এর ফলে প্রকৃত ভারতীয় বাংলাভাষী হিন্দু বা মুসলমানরাও ‘অনুপ্রবেশকারী’ হিসেবে চিহ্নিত হয়ে যাওয়ার ঝুঁকিতে পড়বেন।
নিচে এআই টুলটি যে সকল বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে কাজ করতে পারে এবং এর সম্ভাব্য সীমাবদ্ধতাগুলো একটি টেবিলের মাধ্যমে তুলে ধরা হলো:
| বিষয় | এআই ব্যবহারের সম্ভাব্য ভিত্তি | বিদ্যমান সীমাবদ্ধতা ও ঝুঁকি |
| ভাষা ও বাচনভঙ্গি | আঞ্চলিক উপভাষা ও শব্দের উচ্চারণ। | সীমান্তবর্তী দুই দেশের মানুষের ভাষার টান প্রায় অভিন্ন। |
| শারীরিক অবয়ব | দাড়ি, টুপি, পোশাক বা নারীদের ক্ষেত্রে বোরকা। | ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক পোশাক ভারত ও বাংলাদেশের মানুষের এক হতে পারে। |
| নথিপত্র যাচাই | ডিজিটাল ডেটাবেসের সঙ্গে নথির মিল খোঁজা। | নথি জালিয়াতি বা নথির অনুপস্থিতিতে ভুল শনাক্তকরণের ঝুঁকি। |
| নির্ভুলতার হার | বর্তমানে ৬০%, লক্ষ্যমাত্রা ১০০%। | এআই বিশেষজ্ঞরা ১০০% নির্ভুলতাকে অসম্ভব বলে মনে করছেন। |
| সামাজিক প্রভাব | দ্রুত শনাক্তকরণ। | ধর্মীয় ও ভাষাগত সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর মধ্যে আতঙ্ক ও বৈষম্যের সৃষ্টি। |
মহারাষ্ট্র সরকারের এই পদক্ষেপটি এমন এক সময়ে এল যখন পশ্চিমবঙ্গ ও আসামে অনেক বাংলাভাষী মুসলমানকে অনুপ্রবেশকারী সন্দেহে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর অভিযোগ উঠেছে। যদিও সরকার দাবি করছে এটি কেবল অবৈধ অভিবাসীদের জন্য, কিন্তু প্রযুক্তির সম্ভাব্য ভুল এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্য নিয়ে সংশয় কাটছে না। মানুষের ভাষা ও সংস্কৃতি যেহেতু রাজনৈতিক সীমারেখা মানে না, তাই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে ‘মানুষের জাতীয়তা’ নির্ধারণ করার এই প্রচেষ্টা শেষ পর্যন্ত কতটা ফলপ্রসূ হবে, তা নিয়ে বড় ধরণের প্রশ্নচিহ্ন রয়েই গেছে।
মন্তব্য