খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ২৪ই জানুয়ারি ২০২৬, ৩:৩৬ পিএম

বিসিবি শেষ পর্যন্ত ভারতে অনুষ্ঠেয় টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে অংশ না নেওয়ার সিদ্ধান্তে অনড় থাকায় বাংলাদেশকে ছাড়াই এই বৈশ্বিক আসর আয়োজনের পথে হাঁটছে আয়োজকরা। তবে বড় ক্রীড়া আসর থেকে সরে দাঁড়ানো বা বর্জনের ঘটনা নতুন নয়। আন্তর্জাতিক ক্রীড়াঙ্গনে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সাংগঠনিক ও নীতিগত নানা কারণে ফুটবল বিশ্বকাপ ও অলিম্পিক গেমস—এই দুই সর্ববৃহৎ আসরে বহুবার বয়কটের নজির দেখা গেছে। ইতিহাসের আলোকে এসব ঘটনা কেবল খেলাধুলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং বিশ্বরাজনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের প্রতিফলন হিসেবেই এগুলো গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
ফুটবল বিশ্বকাপে বয়কটের ইতিহাস
১৯৩০ সালে উরুগুয়েতে অনুষ্ঠিত প্রথম ফুটবল বিশ্বকাপ থেকেই বয়কটের সূচনা। আয়োজক নির্বাচন নিয়ে বিরোধ এবং দীর্ঘ নৌভ্রমণের ঝুঁকি এড়াতে ইউরোপের বেশ কয়েকটি শক্তিশালী দল সে আসরে অংশ নেয়নি। ইতালি, স্পেন, নেদারল্যান্ডস ও সুইডেন আয়োজক নির্বাচনে পরাজয়ের কারণে সরে দাঁড়ায়, আর অস্ট্রিয়া, হাঙ্গেরি, জার্মানি ও সুইজারল্যান্ড দীর্ঘ যাত্রার ধকলের কথা বলে খেলতে অস্বীকৃতি জানায়। একই সঙ্গে ফিফার সঙ্গে দ্বন্দ্বের কারণে ইংল্যান্ড, স্কটল্যান্ড, ওয়েলস ও আয়ারল্যান্ডও বিশ্বকাপ বর্জন করে।
১৯৩৪ সালে ইতালিতে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় বিশ্বকাপে আবার ভিন্ন কারণে বর্জনের মুখে পড়ে আসরটি। আগের বিশ্বকাপের আয়োজক উরুগুয়ে ইউরোপের দেশগুলো তাদের দেশে খেলতে না আসায় প্রতিশোধস্বরূপ ইতালিতে যেতে অস্বীকৃতি জানায়। ১৯৩৮ ফ্রান্স বিশ্বকাপে আয়োজক নির্বাচন ঘিরে ইউরোপ ও দক্ষিণ আমেরিকার দ্বন্দ্ব চরমে পৌঁছায়; ফলে আর্জেন্টিনা ও উরুগুয়ে অংশ নেয়নি।
১৯৫০ সালে ব্রাজিলে আয়োজিত বিশ্বকাপে ভারতের বর্জন ইতিহাসে বিশেষভাবে আলোচিত। ফিফার বুট পরার বাধ্যবাধকতা মানতে না পেরে ভারত সরে দাঁড়ায়—যার পরিণতিতে তারা আর কখনো বিশ্বকাপে খেলার যোগ্যতা অর্জন করতে পারেনি। একই আসরে আর্থিক সংকটের কারণে তুরস্কও অংশ নেয়নি।
১৯৬৬ সালে ইংল্যান্ড বিশ্বকাপে আফ্রিকার ১৫টি দেশ একযোগে বয়কট করে। এশিয়া ও আফ্রিকা মিলিয়ে মাত্র একটি দলকে সুযোগ দেওয়ার সিদ্ধান্তে তারা ক্ষুব্ধ হয়ে বাছাইপর্ব থেকেই সরে দাঁড়ায়। ১৯৭০ সালে ফিলিস্তিনের প্রতি সংহতি জানিয়ে মরক্কো বাছাইপর্ব বর্জন করে। আবার ১৯৭৪ সালে রাজনৈতিক কারণে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন চিলিতে প্লে-অফ খেলতে অস্বীকৃতি জানালে ওয়াকওভার পেয়ে বিশ্বকাপে ওঠে চিলি।
অলিম্পিকে বয়কটের দীর্ঘ ধারা
অলিম্পিক গেমসেও বয়কটের ইতিহাস দীর্ঘ ও জটিল। ১৯৩৬ বার্লিন অলিম্পিকে নাৎসি জার্মানির বর্ণবাদী নীতির প্রতিবাদে স্পেন অংশ নেয়নি। ১৯৫৬ মেলবোর্ন অলিম্পিকে একাধিক আন্তর্জাতিক সংকট একসঙ্গে প্রভাব ফেলে—হাঙ্গেরিতে সোভিয়েত আগ্রাসনের প্রতিবাদে নেদারল্যান্ডস, স্পেন ও সুইজারল্যান্ড সরে দাঁড়ায়, আর সুয়েজ সংকটের জেরে মিসর, ইরাক ও লেবানন অংশ নেয়নি। একই সঙ্গে তাইওয়ানকে আমন্ত্রণ জানানোয় চীনও বর্জন করে।
১৯৭৬ মনট্রিল অলিম্পিকে বর্ণবাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে আফ্রিকার ২৮টি দেশ অংশ নেয়নি। দক্ষিণ আফ্রিকার সঙ্গে ক্রীড়া সম্পর্ক রাখার অভিযোগে নিউজিল্যান্ডের বিরোধিতা করাই ছিল এই বয়কটের মূল কারণ। ঠান্ডা যুদ্ধের সময় সবচেয়ে বড় বয়কট ঘটে ১৯৮০ মস্কো অলিম্পিকে, যখন আফগানিস্তানে সোভিয়েত আগ্রাসনের প্রতিবাদে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে ৬৫টি দেশ অংশ নেয়নি। এর পাল্টা জবাবে ১৯৮৪ লস অ্যাঞ্জেলেস অলিম্পিক বর্জন করে সোভিয়েত ইউনিয়নের নেতৃত্বে ১৪টি দেশ।
উল্লেখযোগ্য বয়কটের সংক্ষিপ্ত চিত্র
| আসর | বছর | বয়কটকারী দেশ/অঞ্চল | মূল কারণ |
|---|---|---|---|
| ফুটবল বিশ্বকাপ | ১৯৩০ | ইউরোপের একাধিক দেশ | আয়োজক বিরোধ, যাতায়াত সমস্যা |
| ফুটবল বিশ্বকাপ | ১৯৫০ | ভারত, তুরস্ক | নীতিগত ও আর্থিক সংকট |
| ফুটবল বিশ্বকাপ | ১৯৬৬ | আফ্রিকার ১৫ দেশ | কোটা বৈষম্য |
| অলিম্পিক | ১৯৫৬ | ৭টি দেশ | হাঙ্গেরি ও সুয়েজ সংকট |
| অলিম্পিক | ১৯৭৬ | আফ্রিকার ২৮ দেশ | বর্ণবাদবিরোধী প্রতিবাদ |
| অলিম্পিক | ১৯৮০ | ৬৫ দেশ | সোভিয়েত আগ্রাসনের প্রতিবাদ |
সব মিলিয়ে দেখা যায়, বিশ্বকাপ ও অলিম্পিকের বয়কটগুলো কেবল খেলাধুলার সিদ্ধান্ত নয়; বরং সময়ের রাজনৈতিক বাস্তবতা, ন্যায়বিচার ও জাতীয় স্বার্থের প্রতিফলন। বর্তমান ক্রীড়াজগতেও তাই বর্জন প্রশ্নটি নতুন করে আলোচনায় আসা অস্বাভাবিক নয়।
মন্তব্য