আন্তর্জাতিক ভূ-রাজনীতিতে এক নাটকীয় মোড় নিয়ে জাতিসংঘভুক্ত বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে নিজেদের প্রত্যাহার করে নিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। এর ফলে দীর্ঘদিনের বৃহত্তম দাতা দেশ হিসেবে ওয়াশিংটনের সাথে সংস্থাটির আর্থিক ও কৌশলগত সম্পর্কের অবসান ঘটল। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর দ্বিতীয় মেয়াদের শুরুতেই গত বছরের দেওয়া ঘোষণা অনুযায়ী এই চূড়ান্ত বিচ্ছেদে স্বাক্ষর করেছেন। কোভিড-১৯ মহামারী চলাকালীন সংস্থাটির ভূমিকা এবং ‘চীন-ঘেঁষা’ অবস্থানের তীব্র সমালোচনা করে এই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়েছে।
Table of Contents
বিচ্ছেদের নেপথ্য কারণ ও মার্কিন যুক্তি
মার্কিন প্রশাসন তাদের এই সিদ্ধান্তের সপক্ষে মহামারী ব্যবস্থাপনায় ডব্লিউএইচও-এর ব্যর্থতা এবং সংস্কারে অনীহাকে প্রধান কারণ হিসেবে দেখিয়েছে। মার্কিন স্বাস্থ্য ও মানবসেবা বিভাগের মতে, সংস্থাটি নির্দিষ্ট কিছু রাষ্ট্রের রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত হতে পারেনি। মার্কিন স্বাস্থ্যমন্ত্রী রবার্ট এফ কেনেডি এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও এক যৌথ বিবৃতিতে দাবি করেছেন, ডব্লিউএইচও তার মূল লক্ষ্য থেকে বিচ্যুত হয়েছে এবং মার্কিন জনগণের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছে। ওয়াশিংটন মনে করে, সংস্থাটি আমেরিকান করদাতাদের অর্থের সঠিক মর্যাদা দিতে ব্যর্থ হয়েছে।
এক নজরে মার্কিন প্রত্যাহার ও এর সম্ভাব্য প্রভাব:
| বিষয়ের বিবরণ | বিস্তারিত তথ্য ও পরিসংখ্যান |
| আর্থিক প্রভাব | ডব্লিউএইচও-এর বৃহত্তম দাতা হিসেবে শত কোটি ডলারের তহবিল বন্ধ। |
| বকেয়া দাবি | সংস্থাটির দাবি অনুযায়ী বকেয়া ২৬০ মিলিয়ন ডলার পরিশোধ করেনি যুক্তরাষ্ট্র। |
| অপারেশনাল প্রভাব | জেনেভাসহ বিশ্বব্যাপী অফিস থেকে মার্কিন কর্মী ও পরামর্শক প্রত্যাহার। |
| বিকল্প কৌশল | বিভিন্ন এনজিও ও দ্বিপাক্ষিক চুক্তির মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবা পরিচালনা। |
| ঝুঁকিতে থাকা খাত | পোলিও, এইচআইভি, মাতৃমৃত্যু ও যক্ষ্মা নির্মূল কর্মসূচি। |
| ভবিষ্যৎ মহামারী | আন্তর্জাতিক মহামারী চুক্তি ও ভ্যাকসিন বণ্টন প্রক্রিয়ায় ধীরগতি। |
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার প্রতিক্রিয়া ও আইনি জটিলতা
ডব্লিউএইচও-এর মহাপরিচালক টেড্রোস আধানম ঘেব্রেয়েসাস মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের এই সিদ্ধান্তকে ‘বিশ্বের জন্য ক্ষতিকর’ বলে বর্ণনা করেছেন। সংস্থাটির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ২০২৪ এবং ২০২৫ সালের জন্য তাদের নির্ধারিত ফি পরিশোধ করেনি, যার ফলে সংস্থাটি ইতোমধ্যে বড় ধরনের বাজেট ঘাটতি ও কর্মী ছাঁটাইয়ের মুখে পড়েছে। ডব্লিউএইচও-এর আইনি কর্মকর্তারা দাবি করেছেন যে, আন্তর্জাতিক প্রটোকল অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্র ২৬০ মিলিয়ন ডলার বকেয়া পরিশোধ করতে বাধ্য। তবে ওয়াশিংটন সাফ জানিয়ে দিয়েছে, এই অর্থ পরিশোধের কোনো যৌক্তিক কারণ তারা দেখছে না।
বৈশ্বিক স্বাস্থ্য কর্মসূচিতে বড় ধাক্কা
যুক্তরাষ্ট্রের এই প্রস্থান কেবল রাজনৈতিক নয়, বরং মানবিক দিক থেকেও উদ্বেগজনক। পোলিও নির্মূল, এইচআইভি-এইডস এবং তামাক নিয়ন্ত্রণের মতো আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টায় যুক্তরাষ্ট্র ছিল অন্যতম প্রধান অংশীদার। এখন এই কর্মসূচগুলো অর্থায়নের অভাবে মুখ থুবড়ে পড়ার শঙ্কায় রয়েছে। যদিও মার্কিন কর্মকর্তাদের দাবি, তারা বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থা (NGO) এবং বিশ্বাস-ভিত্তিক গোষ্ঠীর মাধ্যমে এই কাজগুলো চালিয়ে যাবে, তবে বৈশ্বিক সমন্বয় ছাড়া তা কতটা সফল হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।
মহামারী ব্যবস্থাপনা ও রাজনৈতিক বিতর্ক
গবেষণায় দেখা গেছে, কোভিড-১৯ মহামারীর সময় মাস্ক পরা এবং সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার মতো ডব্লিউএইচও-এর বৈজ্ঞানিক পরামর্শগুলো যুক্তরাষ্ট্রে ব্যাপক রাজনৈতিক বিতর্কের জন্ম দিয়েছিল। ট্রাম্পের গত মেয়াদের নীতি এবং রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট শাসিত রাজ্যগুলোর মধ্যকার মতভেদ যুক্তরাষ্ট্রে সংক্রমণের হার বৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছিল বলে অনেক সাবেক স্বাস্থ্য কর্মকর্তা মনে করেন। নতুন এই সিদ্ধান্তের ফলে ভবিষ্যতে কোনো বিশ্বজনীন মহামারী দেখা দিলে ভ্যাকসিন ও ওষুধের ন্যায়সঙ্গত বণ্টন নিশ্চিত করার আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টা বড় ধরনের বাধার সম্মুখীন হবে।
উপসংহার
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা থেকে যুক্তরাষ্ট্রের বিদায় মূলত বিশ্ব স্বাস্থ্য কূটনীতির একটি বড় অধ্যায়ের সমাপ্তি। জেনেভায় আসন্ন বোর্ড সভায় এই প্রত্যাহারের বিষয়টি মূল আলোচ্যসূচিতে রাখা হয়েছে। এখন দেখার বিষয়, ওয়াশিংটন এককভাবে তাদের জনস্বাস্থ্য নীতি কতটা সফলভাবে পরিচালনা করতে পারে এবং ডব্লিউএইচও এই বিশাল আর্থিক শূন্যতা কাটিয়ে কীভাবে বিশ্ববাসীকে সেবা দিয়ে যায়।
