ইরানজুড়ে চলমান নজিরবিহীন সরকারবিরোধী আন্দোলনের মুখে গ্রেপ্তারকৃত ‘দাঙ্গাকারীদের’ বিরুদ্ধে বিচারিক প্রক্রিয়া ও কঠোর দণ্ড প্রদানের ঘোষণা দিয়েছে দেশটির শীর্ষ কর্তৃপক্ষ। সোমবার (১৯ জানুয়ারি, ২০২৬) এক বিশেষ বার্তায় ইরানের বিচার বিভাগের প্রধান গোলাম-হোসেইন মোহসেনি-এজেই বিক্ষোভকারীদের কোনো ধরনের ছাড় না দেওয়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছেন। বিচারিক এই কঠোরতার পাশাপাশি তথ্যপ্রবাহ রুখতে দেশজুড়ে ইন্টারনেট পরিষেবা প্রায় সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন করে রাখা হয়েছে।
Table of Contents
বিচার বিভাগের কঠোর হুঁশিয়ারি
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক পোস্টে মোহসেনি-এজেই স্পষ্ট করে বলেন, “সাম্প্রতিক পরিস্থিতি নিয়ে বিচার বিভাগের মূল কাজ এখন থেকেই শুরু হলো। যিনি দয়া পাওয়ার যোগ্য নন, তাঁকে যদি অযথা ছাড় দেওয়া হয়, তবে তা ন্যায়ের পরিপন্থী হবে।” তাঁর এই কঠোর মন্তব্য এমন এক সময়ে এল যখন ইরান সরকার বিক্ষোভ দমনে নিরাপত্তা বাহিনীকে সর্বোচ্চ ক্ষমতা প্রদান করেছে।
বিক্ষোভ মোকাবিলায় সম্প্রতি ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসউদ পেজেশকিয়ান এবং সংসদের স্পিকার মোহাম্মদ বাকের গালিবাফের সঙ্গে এক জরুরি বৈঠকে মিলিত হন এজেই। বৈঠক শেষে প্রকাশিত এক যৌথ বিবৃতিতে তিন শীর্ষ নেতা জানান, তথাকথিত ‘খুনি ও সন্ত্রাসী উসকানিদাতাদের’ বিরুদ্ধে বিন্দুমাত্র নমনীয়তা দেখানো হবে না। তবে যারা বিদেশি শক্তির প্ররোচনায় ‘ভুলবশত’ বিক্ষোভে অংশ নিয়েছে, তারা কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে কিছুটা ‘ইসলামি সহানুভূতি’ পেতে পারে বলে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে।
বিক্ষোভের প্রেক্ষাপট ও বর্তমান পরিস্থিতি
ইরানি কর্তৃপক্ষ বরাবরের মতোই দাবি করে আসছে যে, এই বিক্ষোভের নেপথ্যে পশ্চিমা শক্তি, বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের প্রত্যক্ষ মদদ রয়েছে। গত ২৮ ডিসেম্বর তেহরানের বাণিজ্যিক এলাকা থেকে শুরু হওয়া দোকানদারদের এই আন্দোলন বর্তমানে ইরানের প্রায় সবকটি বড় শহরে ছড়িয়ে পড়েছে। সরকারের দাবি, বিদেশি এজেন্টরা বিক্ষোভকারীদের অর্থ ও অস্ত্র সরবরাহ করে দেশে অরাজকতা সৃষ্টির চেষ্টা করছে।
ইরান বিক্ষোভ পরিস্থিতির বর্তমান চিত্র:
| বিষয়ের বিবরণ | বর্তমান পরিসংখ্যান ও তথ্য |
| বিক্ষোভের সূত্রপাত | ২৮ ডিসেম্বর, ২০২৫ (তেহরান)। |
| আনুমানিক গ্রেপ্তার সংখ্যা | ১০,০০০ জনেরও বেশি। |
| সরকারের অভিযোগ | সন্ত্রাসবাদ, লুণ্ঠন ও বিদেশি প্ররোচনা। |
| যোগাযোগ ব্যবস্থা | দেশজুড়ে কঠোর ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট। |
| নিহতের সংখ্যা | কয়েক হাজার (খামেনির ভাষ্যমতে)। |
| মূল দাবি | অর্থনৈতিক মুক্তি ও শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন। |
সর্বোচ্চ নেতার ভাষণ ও গণ-গ্রেপ্তার
গত শনিবার ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি এক ভাষণে জানিয়েছেন যে, সাম্প্রতিক বিক্ষোভে ‘কয়েক হাজার মানুষ’ নিহত হয়েছে। তবে তিনি এই হত্যাকাণ্ডের দায় রাষ্ট্রীয় বাহিনীর ওপর না চাপিয়ে বরং বিদেশি এজেন্টদের ওপর চাপিয়েছেন। তাঁর মতে, শত্রুরা ইরানকে অস্থিতিশীল করতে পরিকল্পিতভাবে এই রক্তপাত ঘটাচ্ছে।
বর্তমানে তেহরানের এভিন কারাগারসহ বিভিন্ন বন্দিশালাগুলো ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত কয়েদীতে পরিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। সরকার প্রতিদিন নতুন নতুন গ্রেপ্তারের ঘোষণা দেওয়ায় জনমনে আতঙ্ক আরও ঘনীভূত হচ্ছে। মানবাধিকার সংস্থাগুলো আশঙ্কা করছে, বিচার বিভাগীয় প্রধানের ঘোষণা অনুযায়ী আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে তড়িঘড়ি করে অনেকের মৃত্যুদণ্ড বা দীর্ঘমেয়াদী কারাদণ্ড কার্যকর করা হতে পারে।
উপসংহার
ইরানের বর্তমান পরিস্থিতি কেবল একটি সাধারণ আন্দোলন নয়, বরং এটি দেশটির শাসনকাঠামোর জন্য এক দীর্ঘমেয়াদী সংকটের ইঙ্গিত দিচ্ছে। একদিকে কঠোর দমন-পীড়ন এবং অন্যদিকে সাধারণ মানুষের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ—সব মিলিয়ে ইরান এক চরম অনিশ্চয়তার দিকে ধাবিত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক মহল ইরানের এই মানবাধিকার পরিস্থিতির ওপর গভীর নজর রাখলেও দেশটির অভ্যন্তরীণ নীতিতে এর কোনো প্রভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে না।
