চলতি ২০২৬ আইপিএলে মাঠের ক্রিকেটে এমনিতেই চরম সংকটে রয়েছে কলকাতা নাইট রাইডার্স (কেকেআর)। দশ দলের এই মেগা টুর্নামেন্টে পয়েন্ট টেবিলের একেবারে তলানিতে থাকা দলটি এবার মাঠের আচরণ ও শৃঙ্খলা নিয়েও বড় বিতর্কে জড়িয়েছে। আজ লখনউয়ের শ্রী অটল বিহারি বাজপেয়ি স্টেডিয়ামে লখনউ সুপার জায়ান্টসের বিপক্ষে ম্যাচে কেকেআর ব্যাটার অংক্রীশ রঘুবংশীর আউটকে কেন্দ্র করে তৈরি হয় নজিরবিহীন উত্তেজনা। মাঠের অসন্তোষ ডাগআউটে গিয়ে রূপ নেয় ভাঙচুরে এবং শেষ পর্যন্ত ম্যাচ কর্মকর্তাদের সঙ্গে দলের প্রধান কোচের তীব্র বাদানুবাদে পরিস্থিতি ঘোলাটে হয়ে ওঠে।
Table of Contents
‘অবস্ট্রাকটিং দ্য ফিল্ড’ ও রঘুবংশীর বিতর্কিত বিদায়
ম্যাচের শুরু থেকেই দুই দলের মধ্যে স্নায়ুচাপ বিরাজ করছিল। ঘটনার সূত্রপাত হয় কেকেআর ইনিংসের পঞ্চম ওভারের শেষ বলে। লখনউয়ের অভিজ্ঞ পেসার মোহাম্মদ শামির একটি বল মিড অনে ঠেলে দিয়ে রান নেওয়ার জন্য পিচের প্রায় মাঝামাঝি পৌঁছে গিয়েছিলেন অংক্রীশ রঘুবংশী। তবে শামি ক্ষিপ্রতার সঙ্গে বলটি সংগ্রহ করে স্ট্রাইক প্রান্তের উইকেট লক্ষ্য করে ছুড়ে মারেন। রান আউটের হাত থেকে বাঁচতে রঘুবংশী তখন মরিয়া হয়ে ক্রিজে ফেরার চেষ্টা করছিলেন।
শামির ছোড়া বলটি সরাসরি রঘুবংশীর গায়ে আঘাত করলে লখনউয়ের ফিল্ডাররা সমস্বরে ‘অবস্ট্রাকটিং দ্য ফিল্ড’-এর আবেদন জানান। মাঠের আম্পায়াররা বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার জন্য তৃতীয় আম্পায়ার রোহন পন্ডিতের সাহায্য চান। ভিডিও রিপ্লে দীর্ঘক্ষণ পর্যালোচনার পর তৃতীয় আম্পায়ার সিদ্ধান্ত দেন যে, রঘুবংশী ক্রিজে ফেরার সময় ইচ্ছাকৃতভাবে তাঁর দৌড়ের পথ পরিবর্তন করেছিলেন, যা ফিল্ডারের বল ছুড়তে বাধা সৃষ্টি করেছে। আইসিসির আইন অনুযায়ী একে ‘ইচ্ছাকৃত বাধা’ হিসেবে গণ্য করে রঘুবংশীকে আউট ঘোষণা করা হয়। আম্পায়ারের এই বিতর্কিত সিদ্ধান্তে মাঠেই তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেন এই তরুণ ব্যাটার।
ডাগআউটে ব্যাট ছুড়ে মারা ও কোচ অভিষেক নায়ারের ক্ষোভ
আম্পায়ারের সিদ্ধান্ত মেনে নিতে না পেরে রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে মাঠ ছাড়েন ৮ বলে ৯ রান করা অংক্রীশ রঘুবংশী। তবে তাঁর মেজাজ হারানোর আসল দৃশ্য দেখা যায় ডাগআউটে ফেরার পর। সেখানে পৌঁছে তিনি হাতের ব্যাটটি সজোরে কুশনের ওপর ছুড়ে মারেন। খেলোয়াড়ের এমন অপেশাদার আচরণ স্টেডিয়ামের জায়ান্ট স্ক্রিনে ধরা পড়লে দর্শকরাও হতবাক হয়ে যান।
পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয় যখন কেকেআরের প্রধান কোচ অভিষেক নায়ার এই আউট নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তিনি ডাগআউটের সীমানায় দাঁড়িয়ে ম্যাচ কর্মকর্তাদের একজনের সঙ্গে তীব্র বাদানুবাদে লিপ্ত হন। দীর্ঘক্ষণ ধরে চলা এই তর্কে কোচের শারীরিক ভাষা ছিল বেশ আক্রমণাত্মক। অভিষেক নায়ারের দাবি ছিল, রঘুবংশী কেবল বলের আঘাত থেকে নিজেকে রক্ষা করার চেষ্টা করছিলেন, ফিল্ডিংয়ে বাধা দেওয়ার কোনো উদ্দেশ্য তাঁর ছিল না। ম্যাচ কর্মকর্তাদের সঙ্গে এমন আচরণ আইপিএলের আচরণবিধি ভঙ্গের শামিল হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
রিঙ্কু সিংয়ের লড়াকু ইনিংস ও ব্যাটিং বিপর্যয়
উত্তেজনাকর এই আবহে কেকেআরের অন্য ব্যাটাররা থিতু হতে ব্যর্থ হলেও ব্যতিক্রম ছিলেন রিংকু সিং। দলের ইনিংস যখন বিপর্যয়ের মুখে, তখন এক প্রান্ত আগলে রেখে লড়াই চালিয়ে যান তিনি। তাঁর আক্রমণাত্মক ব্যাটিংয়ের ওপর ভর করেই কলকাতা নাইট রাইডার্স নির্ধারিত ২০ ওভারে ৭ উইকেট হারিয়ে ১৫৫ রানের সংগ্রহ দাঁড় করাতে সক্ষম হয়।
রিঙ্কু সিং ৫১ বলে অপরাজিত ৮৩ রানের এক বিধ্বংসী ইনিংস খেলেন, যা সাজানো ছিল ৭টি চার এবং ৫টি নান্দনিক ছক্কায়। মূলত রিঙ্কুর এই একক প্রচেষ্টাতেই কলকাতা ১৫০ রানের কোটা পার করতে পেরেছে। অন্য ব্যাটারদের মধ্যে কেউই দুই অঙ্কের ঘরে পৌঁছাতে লড়াই করতে পারেননি, যা পয়েন্ট টেবিলের তলানিতে থাকা দলটির ব্যাটিং ব্যর্থতাকে আবারও স্পষ্ট করেছে।
লখনউয়ের সতর্ক শুরু ও ফিল্ডিংয়ে কেকেআরের চাপ
১৫৬ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে লখনউ সুপার জায়ান্টসের অধিনায়ক ঋষভ পন্ত শুরু থেকেই সাবধানী কৌশল গ্রহণ করেছেন। পেসার মোহাম্মদ শামির নিয়ন্ত্রিত বোলিং ও শুরুতেই ব্রেক-থ্রু পাওয়া লখনউকে মানসিকভাবে সুবিধাজনক অবস্থানে রেখেছে। এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত লখনউ ৭ ওভারে ১ উইকেট হারিয়ে ৪২ রান সংগ্রহ করেছে।
ক্রিকেট বিশ্লেষকদের মতে, ডাগআউটে ঘটে যাওয়া অপ্রীতিকর ঘটনা এবং মানসিক অস্থিরতা কেকেআরের ফিল্ডিং ও বোলিং পরিকল্পনায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে প্রধান কোচের এমন মেজাজ হারানো দলের তরুণ খেলোয়াড়দের আত্মবিশ্বাসে চিড় ধরাতে পারে।
শাস্তির মুখে পড়তে পারেন রঘুবংশী ও কোচ
মাঠের সরঞ্জামের ক্ষতি করা এবং ম্যাচ কর্মকর্তাদের সঙ্গে তর্কে জড়ানোর বিষয়টি ম্যাচ রেফারি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন। আইপিএলের ‘কোড অফ কন্ডাক্ট’ বা আচরণবিধি অনুযায়ী, অংক্রীশ রঘুবংশী এবং অভিষেক নায়ার—উভয়ই শাস্তির সম্মুখীন হতে পারেন। ধারণা করা হচ্ছে, লেভেল-১ পর্যায়ের অপরাধের জন্য তাঁদের ম্যাচ ফির একটি বড় অংশ জরিমানা করা হতে পারে। এমনকি অপরাধের গুরুত্ব বিচার করে পরবর্তী ম্যাচের জন্য নিষেধাজ্ঞার খড়গও নেমে আসতে পারে। রাতের মধ্যেই এ বিষয়ে বিসিসিআই ও আইপিএল কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় রয়েছে ক্রিকেট বিশ্ব।
সংক্ষিপ্ত স্কোরকার্ড (কেকেআর ইনিংস):
কেকেআর: ১৫৫/৭ (২০ ওভার)
রিংকু সিং: ৮৩* (৫১ বল)
অংক্রীশ রঘুবংশী: ৯ (৮ বল)
মোহাম্মদ শামি: ২/২৪
