খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ২১ই জানুয়ারি ২০২৬, ৫:৩৯ এএম

ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যকার দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্রমবর্ধমান তিক্ততার প্রভাব এবার দীর্ঘায়িত হলো দক্ষিণ এশিয়ার আকাশপথে। জম্মু ও কাশ্মীরের পেহেলগামে সংঘটিত ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলার পর দুই দেশের কূটনৈতিক ও সামরিক টানাপোড়েন যে পর্যায়ে পৌঁছেছে, তার সরাসরি প্রতিফলন ঘটেছে পাকিস্তানের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্তে। ভারতীয় নিবন্ধিত সকল বিমানের ওপর আরোপিত আকাশসীমা ব্যবহারের নিষেধাজ্ঞার মেয়াদ আরও এক দফা বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছে ইসলামাবাদ। এই সিদ্ধান্তের ফলে আন্তর্জাতিক এভিয়েশন রুটে বিশেষ করে ভারতের পশ্চিমাঞ্চলীয় ফ্লাইটগুলোর ব্যয় ও সময়—উভয়ই উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে।
Table of Contents
মঙ্গলবার (২০ জানুয়ারি, ২০২৬) পাকিস্তান এয়ারপোর্টস অথরিটি (পিএএ) এক আনুষ্ঠানিক বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এই সিদ্ধান্তের কথা জানায়। নতুন নির্দেশনা অনুযায়ী, ভারতীয় বিমানের ওপর এই নিষেধাজ্ঞা ২০২৬ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি ভোর ৫টা (পাকিস্তান সময়) পর্যন্ত বলবৎ থাকবে।
উল্লেখ্য যে, এই নিষেধাজ্ঞা অত্যন্ত কঠোর ও ব্যাপক। এটি ভারতের মালিকানাধীন, ভারতীয় কোনো সংস্থা দ্বারা পরিচালিত কিংবা লিজ নেওয়া সকল প্রকার বেসামরিক ও বাণিজ্যিক বিমানের ওপর প্রযোজ্য। এমনকি ভারতের সামরিক বিমানগুলোও এই নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকবে। এর মাধ্যমে গত নয় মাস ধরে কার্যকর থাকা বিদ্যমান বিধিনিষেধকেই ২০২৬ সাল পর্যন্ত প্রলম্বিত করা হলো।
এই আকাশপথ যুদ্ধের সূত্রপাত হয় ভারত নিয়ন্ত্রিত জম্মু ও কাশ্মীরের পেহেলগামে এক রক্তক্ষয়ী হামলার মধ্য দিয়ে। ওই ঘটনার পর নয়াদিল্লি কড়া কূটনৈতিক অবস্থান গ্রহণ করে এবং কয়েক দশকের পুরনো ‘সিন্ধু পানি চুক্তি’ (Indus Waters Treaty) স্থগিত করার ঘোষণা দেয়। ভারতের এই পানিবণ্টন নীতি পরিবর্তনের পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে পাকিস্তান তাদের আকাশসীমা থেকে ভারতীয় এয়ারলাইন্সগুলোকে নিষিদ্ধ করে।
পরবর্তীতে, গত ৩০ এপ্রিল ভারত সরকারও প্রতিশোধমূলক ব্যবস্থা হিসেবে পাকিস্তানি এয়ারলাইন্সগুলোর জন্য ভারতের আকাশসীমা ব্যবহারে পূর্ণ নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে। ফলে বর্তমানে দুই দেশের মধ্যে আকাশপথে সরাসরি কোনো ট্রানজিট সুবিধা নেই।
ভারত-পাকিস্তান আকাশসীমা সংকটের ঐতিহাসিক ও বর্তমান প্রেক্ষাপট:
| সংকটের কারণ/সময় | গৃহীত পদক্ষেপ | বর্তমান স্থিতি |
| কারগিল সংঘাত (১৯৯৯) | আকাশসীমা আংশিক বন্ধ। | দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব পড়েনি। |
| বালাকোট/পুলওয়ামা (২০১৯) | দীর্ঘমেয়াদী আকাশসীমা নিষেধাজ্ঞা। | কয়েক মাস পর স্বাভাবিক হয়েছিল। |
| পেহেলগাম হামলা (২০২৫) | নয় মাস আগে নিষেধাজ্ঞা শুরু। | ২০২৬ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বৃদ্ধি। |
| সিন্ধু পানি চুক্তি ইস্যু | ভারতের কঠোর অবস্থান। | পাকিস্তানের পাল্টা আকাশপথ অবরোধ। |
| ব্যবসায়িক প্রভাব | জ্বালানি ও সময় ব্যয় বৃদ্ধি। | দক্ষিণ এশিয়ায় ফ্লাইট ট্রাফিক জটিলতা। |
পাকিস্তানের আকাশসীমা ব্যবহার করতে না পারায় ভারতীয় বিমানগুলোকে বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ এবং উত্তর আমেরিকাগামী ফ্লাইটগুলোর জন্য অনেক দীর্ঘ পথ ঘুরে যেতে হচ্ছে। এর ফলে:
অতিরিক্ত সময়: দুবাই বা লন্ডনের মতো গন্তব্যগুলোতে পৌঁছাতে আগের চেয়ে ২ থেকে ৩ ঘণ্টা বেশি সময় লাগছে।
ভাড়া বৃদ্ধি: দীর্ঘপথের কারণে জ্বালানি খরচ কয়েক গুণ বেড়ে যাওয়ায় বিমানের টিকিটের দাম সাধারণ যাত্রীদের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে।
পরিবেশগত প্রভাব: বেশি পথ পাড়ি দেওয়ার ফলে কার্বন নিঃসরণও বাড়ছে।
পাকিস্তানের এই সিদ্ধান্ত মূলত ভারতের ওপর চাপ সৃষ্টির একটি রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের আকাশসীমা বন্ধের রাজনীতি দক্ষিণ এশিয়ার আঞ্চলিক অর্থনীতি ও পর্যটন খাতের জন্য বড় অন্তরায়। আগামী এক বছরের মধ্যে দুই দেশের সম্পর্কের বরফ গলার কোনো ইঙ্গিত না পাওয়া যাওয়ায় আন্তর্জাতিক এয়ারলাইন্সগুলোকেও এখন দীর্ঘমেয়াদী বিকল্প রুট নিয়ে পরিকল্পনা করতে হচ্ছে।
মন্তব্য