টাঙ্গাইল জেলার মির্জাপুর উপজেলায় মাটি খুঁড়ে বস্তাবন্দি অবস্থায় উদ্ধারকৃত অজ্ঞাত পরিচয় নারী ও নবজাতকের মরদেহের রহস্য গত ছয় দিনেও উদ্ঘাটিত হয়নি। পুলিশ এখন পর্যন্ত নিহতদের পরিচয় শনাক্ত করতে সক্ষম হয়নি। গত সোমবার (২০ এপ্রিল) সন্ধ্যায় উপজেলার জামুর্কী ইউনিয়নের গুনটিয়া গ্রামে লৌহজং নদীর তীরবর্তী এলাকা থেকে এই অর্ধগলিত মরদেহ দুটি উদ্ধার করা হয়। চাঞ্চল্যকর এই ঘটনার পর থেকে এলাকায় আতঙ্ক ও কৌতূহল বিরাজ করছে।
ঘটনার বিবরণ ও মরদেহ উদ্ধার
স্থানীয় সূত্র এবং পুলিশি প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, ২০ এপ্রিল সোমবার বিকেলে গুনটিয়া গ্রামের লৌহজং নদীর পাড়ে স্থানীয় বাসিন্দারা অস্বাভাবিক দুর্গন্ধ পান। অনুসন্ধানের একপর্যায়ে নদীর পাড়ে মাটিচাপা দেওয়া অবস্থায় মানুষের চুল দেখতে পেয়ে এলাকাবাসী মির্জাপুর থানা পুলিশকে খবর দেন।
খবর পেয়ে মির্জাপুর থানার পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায় এবং নির্দিষ্ট স্থানে মাটি খুঁড়ে একটি প্লাস্টিকের বস্তা উদ্ধার করে। পুলিশ জানায়, বস্তাটি বাইরে বের করার পর দেখা যায় তার ভেতরে একজন নারী এবং একটি নবজাতকের মরদেহ রয়েছে। মরদেহ দুটি দীর্ঘ সময় মাটির নিচে থাকায় তাতে পচন ধরেছিল এবং অর্ধগলিত অবস্থায় ছিল।
পরিচয় শনাক্তকরণ ও দাফন
উদ্ধারের পর পুলিশ ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো পরিচয় শনাক্তের প্রাথমিক চেষ্টা চালায়। তবে মরদেহে পচন ধরায় এবং স্থানীয়ভাবে কেউ তাদের শনাক্ত করতে না পারায় আইনি প্রক্রিয়া শেষে মরদেহ দুটিকে মির্জাপুর কেন্দ্রীয় কবরস্থানে ‘অজ্ঞাত’ হিসেবে দাফন করা হয়। নিহতদের ডিএনএ (DNA) প্রোফাইলিংয়ের জন্য প্রয়োজনীয় নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে যাতে ভবিষ্যতে কেউ দাবিদার এলে পরিচয় নিশ্চিত করা যায়।
পুলিশের বক্তব্য ও তদন্তের অগ্রগতি
মির্জাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল্লাহ আল মামুন জানান, মরদেহগুলো উদ্ধারের সময় বস্তাটি ঝাকুনি দেওয়ার সাথে সাথে নারীর মরদেহের পাশেই নবজাতকের দেহটি পাওয়া যায়। পুলিশের প্রাথমিক অনুমান অনুযায়ী, নিহত নারী প্রায় ৭-৮ মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন।
তদন্তের স্বার্থে পুলিশ নিম্নোক্ত পদক্ষেপগুলো গ্রহণ করেছে:
ময়নাতদন্ত: মরদেহ দুটি টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতালে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছিল। ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হলেও চূড়ান্ত রিপোর্টের অপেক্ষায় রয়েছে পুলিশ।
ডিএনএ টেস্ট: পরিচয় শনাক্তের লক্ষ্যে ডিএনএ পরীক্ষার জন্য টিস্যু ও হাড়ের নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞ দলের সহায়তা: মামলার জট খুলতে এবং বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে তদন্ত কার্যক্রম এগিয়ে নিতে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) টিমকে যুক্ত করা হয়েছে।
সারাদেশে বার্তা প্রেরণ: পরিচয় শনাক্তের জন্য নিহতদের বিবরণ ও তথ্য দেশের সকল থানায় বার্তা হিসেবে পাঠানো হয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিভ্রান্তি ও পুলিশের সতর্কতা
এই হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে গত কয়েকদিন ধরে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি স্পর্শকাতর পোস্ট ভাইরাল হয়েছে। সেখানে দাবি করা হচ্ছে, টাঙ্গাইলে জনৈক গর্ভবতী নারীকে ধর্ষণের পর তাঁর পেট থেকে শিশু বের করে মা ও শিশুকে হত্যা করা হয়েছে। তবে পুলিশ এই তথ্যটিকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে প্রত্যাখ্যান করেছে।
ওসি আব্দুল্লাহ আল মামুন এ প্রসঙ্গে বলেন, “সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যা প্রচার করা হচ্ছে তা সম্পূর্ণ বিভ্রান্তিকর ও অপপ্রচার। মরদেহ উদ্ধারের তথ্য সত্য, কিন্তু ময়নাতদন্তের রিপোর্ট না আসা পর্যন্ত মৃত্যুর সঠিক কারণ বা ধর্ষণের মতো কোনো ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। আমরা রিপোর্ট পাওয়ার পরই কেবল বলতে পারব এটি পরিকল্পিত হত্যা নাকি অন্য কোনো দুর্ঘটনা।” তিনি সাধারণ মানুষকে এই ধরনের সংবেদনশীল বিষয়ে গুজব না ছড়াতে এবং ময়নাতদন্তের রিপোর্টের জন্য অপেক্ষা করার অনুরোধ জানিয়েছেন।
স্থানীয় প্রতিক্রিয়া ও উদ্বেগ
ছয় দিন পার হয়ে গেলেও পরিচয় ও খুনের রহস্য উন্মোচিত না হওয়ায় গুনটিয়া গ্রামসহ পার্শ্ববর্তী এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। স্থানীয়দের ধারণা, এই নারী ও নবজাতক এই এলাকার বাসিন্দা নন। অন্য কোনো স্থান থেকে তাঁদের হত্যা করে নির্জন নদীর পাড়ে মাটিচাপা দিয়ে রাখা হয়েছিল। লোহজং নদীর পাড় এলাকাটি নির্জন হওয়ায় অপরাধীরা এই স্থানটিকে মরদেহ গুম করার জন্য বেছে নিয়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
বর্তমানে মির্জাপুর থানার পুলিশ এবং পিবিআই যৌথভাবে এই ঘটনার ছায়া তদন্ত করছে। পুলিশ জানিয়েছে, নিহত নারীর বয়স আনুমানিক ২০ থেকে ২৫ বছরের মধ্যে হতে পারে। ময়নাতদন্তের চূড়ান্ত রিপোর্ট হাতে পেলে এবং ডিএনএ পরীক্ষার ফলাফল পাওয়া গেলে হত্যাকাণ্ডের ধরন এবং নিহতদের পরিচয় সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে। পুলিশ এ বিষয়ে স্থানীয়দের কাছ থেকে কোনো তথ্য থাকলে তা দিয়ে সহযোগিতার আহ্বান জানিয়েছে।
Table of Contents
মির্জাপুরে লোহজং নদীর তীরে বস্তাবন্দি মরদেহ: ছয় দিনেও রহস্যের জট খোলেনি
টাঙ্গাইলের মির্জাপুর উপজেলায় মাটি খুঁড়ে উদ্ধার হওয়া অজ্ঞাতপরিচয় নারী ও নবজাতকের মরদেহের পরিচয় গত ছয় দিনেও শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। গত সোমবার (২০ এপ্রিল) সন্ধ্যায় উপজেলার জামুর্কী ইউনিয়নের গুনটিয়া গ্রাম সংলগ্ন লৌহজং নদীর পাড় থেকে মরদেহ দুটি উদ্ধার করেছিল মির্জাপুর থানা পুলিশ। চাঞ্চল্যকর এই ঘটনার পর প্রায় এক সপ্তাহ অতিবাহিত হতে চললেও নিহতদের পরিচয় বা হত্যাকাণ্ডের কারণ সম্পর্কে কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য উদ্ঘাটন করতে না পারায় স্থানীয় জনমনে গভীর উদ্বেগ ও আতঙ্ক বিরাজ করছে।
ঘটনার প্রেক্ষাপট ও লোমহর্ষক উদ্ধার অভিযান
স্থানীয় বাসিন্দা ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গত ২০ এপ্রিল বিকেলে গুনটিয়া গ্রামে লৌহজং নদীর তীরবর্তী এলাকায় পচা দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়লে স্থানীয়দের মনে সন্দেহের সৃষ্টি হয়। দুর্গন্ধের উৎস খুঁজতে গিয়ে জনৈক গ্রামবাসী নদীর পাড়ে আলগা মাটির নিচে মানুষের চুলের গোছা দেখতে পান। তাৎক্ষণিকভাবে বিষয়টি থানা পুলিশকে অবহিত করা হলে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে খনন কাজ শুরু করে।
মাটি খুঁড়ে একটি প্লাস্টিকের বস্তা উদ্ধার করা হয়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বস্তাটি বাইরে বের করে খোলার পর তার ভেতর থেকে একজন প্রাপ্তবয়স্ক নারী এবং একটি নবজাতকের অর্ধগলিত মরদেহ বেরিয়ে আসে। মরদেহ দুটি দীর্ঘ সময় মাটির নিচে চাপা পড়ে থাকায় তাতে তীব্র পচন ধরেছিল। পরিচয় শনাক্তের কোনো উপায় না পাওয়ায় গত কয়েকদিন আগে আইনি প্রক্রিয়া শেষে মরদেহ দুটিকে মির্জাপুর কেন্দ্রীয় কবরস্থানে বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা হয়েছে।
ময়নাতদন্ত ও ফরেনসিক তদন্তের সর্বশেষ অবস্থা
মির্জাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আব্দুল্লাহ আল মামুন জানিয়েছেন, মরদেহ উদ্ধারের সময় বস্তার ভেতরে নারীর দেহের পাশেই নবজাতকটিকে পাওয়া যায়। পুলিশের প্রাথমিক সুরতহাল প্রতিবেদনে ধারণা করা হচ্ছে, নিহত নারী প্রায় ৭-৮ মাসের অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন। মৃত্যুর সঠিক কারণ নিশ্চিত করতে মরদেহ দুটি টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতাল মর্গে ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছিল।
তদন্তের অগ্রগতি সম্পর্কে পুলিশ জানায়:
ডিএনএ প্রোফাইলিং: পরিচয় শনাক্তের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে নিহতদের টিস্যু ও হাড়ের নমুনা সংগ্রহ করে ডিএনএ (DNA) পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়েছে।
পিবিআই-এর সম্পৃক্ততা: মামলার রহস্য উদ্ঘাটনে জেলা পুলিশের পাশাপাশি পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)-এর একটি বিশেষজ্ঞ দল ছায়া তদন্ত শুরু করেছে।
দেশব্যাপী তথ্য যাচাই: অজ্ঞাত ওই নারী ও শিশুর বিবরণ দিয়ে দেশের প্রতিটি থানায় ‘নিখোঁজ’ সংবাদ যাচাইয়ের জন্য বার্তা পাঠানো হয়েছে।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে গুজব ও বিভ্রান্তি রোধে সতর্কতা
মরদেহ উদ্ধারের পর থেকে ফেসবুকসহ বিভিন্ন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে একটি স্পর্শকাতর তথ্য ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। ভাইরাল হওয়া ওই পোস্টে দাবি করা হচ্ছে, জনৈক গর্ভবতী নারীকে ধর্ষণের পর তাঁর পেট কেটে সন্তান বের করে মা ও শিশুকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হয়েছে। তবে পুলিশ এই দাবিকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও ‘ডিজিটাল গুজব’ বলে আখ্যায়িত করেছে।
ওসি আব্দুল্লাহ আল মামুন এ বিষয়ে কঠোর সতর্কবার্তা উচ্চারণ করে বলেন, “সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে যা প্রচার করা হচ্ছে তা সম্পূর্ণ অপপ্রচার। ময়নাতদন্তের চূড়ান্ত রিপোর্ট না আসা পর্যন্ত এটি হত্যাকাণ্ড নাকি অন্য কিছু, তা নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয়। এমনকি ধর্ষণ বা পেট কেটে সন্তান বের করার মতো কোনো চিহ্ন প্রাথমিকভাবে মেলেনি।” তিনি সাধারণ মানুষকে সামাজিক অস্থিরতা তৈরি করতে পারে এমন কোনো তথ্য শেয়ার না করার অনুরোধ জানিয়েছেন।
স্থানীয় জনপদে আতঙ্ক ও রহস্যের দানা
মরদেহ উদ্ধারের পর ছয় দিন পার হলেও কোনো দাবিদার না আসায় স্থানীয়দের মধ্যে নানা প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে। এলাকাবাসীর ধারণা, ওই নারী স্থানীয় বাসিন্দা নন; অপরাধীরা অন্য কোথাও হত্যাকাণ্ড ঘটিয়ে নির্জন নদীর পাড় এলাকাটিকে মরদেহ গুম করার নিরাপদ স্থান হিসেবে বেছে নিয়েছে। গুনটিয়া গ্রামের লোহজং নদীর পাড় এলাকাটি সাধারণত জনশূন্য থাকে বলেই খুনিরা রাতের আঁধারে মাটিচাপা দেওয়ার কাজটি সম্পন্ন করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
পুলিশ জানিয়েছে, নিহত নারীর বয়স আনুমানিক ২০ থেকে ২৫ বছরের মধ্যে। ময়নাতদন্তের পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন এবং ডিএনএ পরীক্ষার ফলাফল হাতে পেলে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এবং নিহতদের পরিচয় সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে। বর্তমানে মির্জাপুর থানার একাধিক টিম এবং পিবিআই কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে গঠিত বিশেষ দল এই ঘটনার তদন্ত চালিয়ে যাচ্ছে। রহস্যময় এই ডাবল মার্ডার বা মৃত্যুর ঘটনায় কোনো তথ্য জানা থাকলে তা পুলিশকে দিয়ে সহযোগিতার আহ্বান জানানো হয়েছে।
তদন্তাধীন তথ্যের সংক্ষিপ্ত সারণি:
