সরকারি নিয়ন্ত্রণে ওষুধ খাতের দুর্বল অবস্থান

বাংলাদেশের ওষুধ শিল্প বর্তমানে গভীর সংকটের মুখোমুখি। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, শুধুমাত্র কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠানকে বাদ দিলে প্রায় ৬০ শতাংশ ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান টিকে থাকা কঠিন অবস্থার মধ্যে রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৪০ শতাংশ কোম্পানি বন্ধ হয়ে গেছে বা বন্ধ হওয়ার পথে, যা দেশীয় ওষুধের স্বয়ংসম্পূর্ণতা ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মের স্বাস্থ্য নিরাপত্তার জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করছে।

এই তথ্য উঠে এসেছে বাংলাদেশ ঔষধ শিল্প সমিতি (বাপি) আয়োজিত ‘বাংলাদেশ ফার্মা ইন্ডাস্ট্রি: প্রেজেন্ট চ্যালেঞ্জ অ্যান্ড ফিউচার প্রসপেক্টস’ শীর্ষক কর্মশালায়, যা শনিবার গাজীপুরের একটি রিসোর্টে অনুষ্ঠিত হয়।

বাপির সভাপতি আব্দুল মুক্তাদির বলেন, “দেশের ওষুধ শিল্পের শক্তি মূলত ক্ষুদ্র ও মাঝারি প্রতিষ্ঠানগুলো দ্বারা গড়ে উঠেছিল। আজ সেই ভিত্তিই ভেঙে পড়ছে। তালিকাভুক্ত ১০০ কোম্পানির মধ্যে মাত্র ১৫–২০টি তুলনামূলকভাবে ভালো অবস্থায় আছে। বিশেষ করে ৫০–১০০ নম্বরের অবস্থানে থাকা কোম্পানিগুলো শোচনীয় অবস্থায় রয়েছে।”

তিনি আরও জানান, “অনেক কোম্পানি ৩০–৪০ বছর ধরে একই মূল্যে ওষুধ বিক্রি করছে। সরকার ১৯৯০ সালের দাম অনুযায়ী ২০২৫–২৬ সালে মূল্য বৃদ্ধির অনুমতি দিচ্ছে না। অথচ উৎপাদন খরচ, কাঁচামালের আন্তর্জাতিক মূল্য, শ্রম ও মান নিয়ন্ত্রণের ব্যয় বহু গুণ বেড়েছে। এই পরিস্থিতিতে টিকে থাকা প্রায় অসম্ভব।”

বাপি মহাসচিব ডা. মো. জাকির হোসেন বলেন, “অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা সম্প্রসারণ এবং মূল্য নির্ধারণের আগে শিল্পের সঙ্গে পরামর্শ করা হয়নি। এমন সিদ্ধান্ত বাস্তবভিত্তিক নয় এবং শিল্পের টেকসই উন্নয়নে বাধা সৃষ্টি করছে।”

বাপির নেতারা উল্লেখ করেন, ক্ষুদ্র ও মাঝারি কোম্পানি ধ্বংস হলে প্রভাব শুধুমাত্র শিল্পে সীমাবদ্ধ থাকবে না। বড় কোম্পানিগুলো রপ্তানিমুখী হয়ে গেলে অভ্যন্তরীণ বাজারে ওষুধের প্রাপ্যতা, দাম ও মান অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়বে।

ওষুধ শিল্পের বর্তমান অবস্থার সংক্ষিপ্ত চিত্র

কোম্পানির ধরণসংখ্যা (প্রায়)বর্তমান অবস্থা
বড় কোম্পানি10–15ভালো অবস্থায়, টেকসই
মাঝারি কোম্পানি30–35সংকটে, অস্থিতিশীল
ক্ষুদ্র কোম্পানি40–45বন্ধ হওয়ার পথে বা বন্ধ

মুক্তাদির আরও বলেন, “১৯৯৪ সালের ওষুধ নীতি শিল্পের স্বর্ণ যুগের ভিত্তি গড়েছিল। স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতার সক্ষমতা তৈরি হয়েছিল। তবে ২০১৬ সালের পর অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ, বৈষম্যমূলক নীতি ও বাস্তবতা-বর্জিত সিদ্ধান্ত শিল্পকে দুর্বল করেছে। ভেনেজুয়েলার উদাহরণ দেখায়, অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ কীভাবে শিল্প ও অর্থনীতি ধ্বংস করতে পারে।”

কর্মশালায় বাপির সাংগঠনিক সম্পাদক মো. মিজানুর রহমান, কোষাধ্যক্ষ হালিমুজ্জামান, বাংলাদেশ হেলথ রিপোর্টার্স ফোরামের সভাপতি প্রতীক ইজাজ এবং সাধারণ সম্পাদক মুজাহিদ শুভ উপস্থিত ছিলেন। তারা শিল্পের অগ্রগতির জন্য নীতি-সংশোধনের গুরুত্ব পুনর্ব্যক্ত করেন এবং প্রয়োজনীয় সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণের আহ্বান জানান।