গাজায় দীর্ঘস্থায়ী সামরিক আগ্রাসন শেষে ইসরায়েলি সেনাদের মধ্যে ‘পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার’ (PTSD) এবং আত্মহত্যার প্রবণতা এক ভয়াবহ সংকটে রূপ নিয়েছে। ইসরায়েলের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় এবং স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠান ‘ম্যাকাবি’-এর ২০২৫ সালের বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, যুদ্ধক্ষেত্র থেকে ফিরে আসা সেনাদের একটি বিশাল অংশ চরম মানসিক অস্থিরতায় ভুগছেন। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া এই রক্তক্ষয়ী সংঘাতের পর থেকে সেনাদের মধ্যে মানসিক রোগের হার প্রায় ৪০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, যথাযথ ব্যবস্থা না নিলে ২০২৮ সাল নাগাদ এই হার ১৮০ শতাংশ পর্যন্ত ছাড়িয়ে যেতে পারে।
পিএসটিডি ও মানসিক সংকটের পরিসংখ্যান
ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের তথ্যমতে, গাজা অভিযানে আহত ২২ হাজার ৩০০ সেনার মধ্যে অন্তত ৬০ শতাংশ সদস্য পিএসটিডিতে আক্রান্ত। এছাড়া অনেক সেনা সদস্য সরাসরি কোনো আঘাত না পেলেও যুদ্ধের ভয়াবহতা দেখে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন। ইসরায়েলের ‘এমেক মেডিকেল সেন্টার’-এর মনোবিজ্ঞানী রোনেন সিদি এই পরিস্থিতির দুটি প্রধান কারণ চিহ্নিত করেছেন। প্রথমটি হলো যুদ্ধক্ষেত্রে অনবরত মৃত্যুর আতঙ্ক এবং দ্বিতীয়টি হলো ‘নৈতিক আঘাত’ (Moral Injury)—অর্থাৎ যুদ্ধের সময় বেসামরিক নাগরিকদের ওপর চালানো নৃশংসতা বা এমন কোনো কাজ যা এখন তাঁদের বিবেককে তাড়িত করছে।
ইসরায়েলি সেনাদের মানসিক স্বাস্থ্য সংকটের একটি তুলনামূলক চিত্র নিচে দেওয়া হলো:
| ক্যাটাগরি | পরিসংখ্যান ও তথ্য |
| মানসিক রোগের প্রবৃদ্ধি | ২০২৩ সেপ্টেম্বর থেকে ২০২৫ জুলাই পর্যন্ত ৪০% বৃদ্ধি। |
| আহত সেনাদের অবস্থা | আহতদের ৬০% পিএসটিডিতে (PTSD) আক্রান্ত। |
| আত্মহত্যার পরিসংখ্যান | ২০২৪ সালের মোট আত্মহত্যার ৭৮% ছিল সাবেক সেনা। |
| আত্মহত্যার চেষ্টা | জানুয়ারি ২০২৪ – জুলাই ২০২৫ এর মধ্যে ২৭৯ জন। |
| চিকিৎসা প্রত্যাশী | ম্যাকাবি সেন্টারে চিকিৎসাধীন সেনাদের ৩৯% মানসিক সহায়তা চেয়েছেন। |
আত্মহত্যার প্রবণতা ও উদ্বেগ
ইসরায়েলি পার্লামেন্ট কমিটির দেওয়া তথ্যমতে, ২০২৪ সালের শুরু থেকে ২০২৫ সালের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত ২৭৯ জন ইসরায়েলি সেনা আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন। এটি আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি। সবচেয়ে আতঙ্কের বিষয় হলো, ২০২৪ সালে পুরো ইসরায়েলে যতজন মানুষ আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছেন, তাঁদের প্রায় ৮০ শতাংশই ছিলেন গাজা যুদ্ধে অংশ নেওয়া সেনা সদস্য। মনোবিজ্ঞানীদের মতে, যুদ্ধের ময়দান থেকে ফেরার পর স্বাভাবিক জীবনে মানিয়ে নিতে ব্যর্থ হওয়া এবং নিজের কৃতকর্মের অনুশোচনা তাঁদের এই চরম পথের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
গাজার ধ্বংসলীলা ও মানবিক বিপর্যয়
ইসরায়েলি সেনাদের মানসিক সংকটের বিপরীতে ফিলিস্তিনিদের ওপর চালানো বর্বরতার চিত্রটি আরও ভয়াবহ। গত দুই বছরের হামলায় গাজায় ৭১ হাজারের বেশি ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। ২০ লাখেরও বেশি মানুষ বারবার বাস্তুচ্যুত হয়ে খোলা আকাশের নিচে দিন কাটাচ্ছেন। গাজার স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, দিনের পর দিন বিমান হামলা, ক্ষুধা এবং স্বজন হারানোর যন্ত্রণায় ফিলিস্তিনিদের প্রতিটি পরিবার এখন এক চরম মানসিক ট্রমার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, যা থেকে কাটিয়ে উঠতে হয়তো কয়েক প্রজন্ম সময় লাগবে।
ইসরায়েলি মনোবিজ্ঞানী রোনেন সিদি সতর্ক করে দিয়েছেন যে, যদি এই মানসিক রোগীদের দ্রুত বিশেষায়িত চিকিৎসার আওতায় আনা না হয়, তবে ইসরায়েলি সমাজ এক বিশাল অভ্যন্তরীণ সংকটের মুখোমুখি হবে। যুদ্ধের দামামা হয়তো থেমেছে, কিন্তু সেনাদের মনের ভেতরে শুরু হওয়া এই যুদ্ধ থামার কোনো লক্ষণ নেই।
