পাঁচ ব্যাংকের নিরীক্ষকদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিচ্ছে সরকার

দেশের ব্যাংকিং খাতের অস্থিরতা দূর করতে এবং আর্থিক স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনতে কঠোর অবস্থান গ্রহণ করেছে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। সম্প্রতি অনিয়মের দায়ে অভিযুক্ত পাঁচটি বেসরকারি ব্যাংকের শেয়ার ক্রয়ের পটভূমি এবং তাদের আর্থিক প্রতিবেদনের সত্যতা যাচাইয়ের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। মঙ্গলবার সচিবালয়ে সরকারি ক্রয়-সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির বৈঠক শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ জানান, বিতর্কিত এই ব্যাংকগুলোর নিরীক্ষকদের (Auditors) বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।

তদন্তের আওতায় থাকা ব্যাংকসমূহ

যে পাঁচটি ব্যাংকের আর্থিক কার্যক্রম ও শেয়ার ধারণের বিষয়টি নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে, সেগুলো হলো:

১. ফার্স্ট সিকিউরিটি ইসলামী ব্যাংক

২. সোশ্যাল ইসলামী ব্যাংক লিমিটেড (এসআইবিএল)

৩. এক্সিম ব্যাংক

৪. গ্লোবাল ইসলামী ব্যাংক

৫. ইউনিয়ন ব্যাংক

নিরীক্ষকদের দায় ও আইনি পদক্ষেপ

৫ আগস্ট ২০২৪-এর রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের আগে উল্লিখিত ব্যাংকগুলোর আর্থিক প্রতিবেদনে ব্যাপক মুনাফা দেখানো হয়েছিল। বিনিয়োগকারীদের অভিযোগ, তারা এসব স্থিতিপত্র বা ব্যালেন্স শিট দেখেই শেয়ার বাজারে বিনিয়োগ করেছিলেন। তবে পরবর্তীতে জানা যায়, এসব প্রতিবেদনে তথ্যের কারচুপি ছিল। এই প্রসঙ্গে অর্থ উপদেষ্টা বলেন, “ব্যবস্থা তো নেওয়া হবেই। যারা এই ত্রুটিপূর্ণ প্রতিবেদন নিরীক্ষা করেছেন, তাদের কোনোভাবেই ছাড় দেওয়া হবে না।” তবে তদন্তের স্বার্থে এখনই সব তথ্য প্রকাশ করতে চাননি তিনি।

আমানতকারী বনাম শেয়ারহোল্ডার: জটিল সমীকরণ

শেয়ারহোল্ডারদের ক্ষতিপূরণের বিষয়ে উপদেষ্টা জানান, বিষয়টি বেশ জটিল। তিনি আমানতকারী ও শেয়ারহোল্ডারদের মধ্যে পার্থক্য তুলে ধরে বলেন:

বিষয়আমানতকারী (Depositors)শেয়ারহোল্ডার (Shareholders)
অধিকারের ধরণগচ্ছিত টাকা ফেরত পাওয়া।প্রতিষ্ঠানের মালিকানার অংশীদার হওয়া।
ঝুঁকির মাত্রাঝুঁকি অত্যন্ত কম এবং সুরক্ষিত।বাজার দরের ওপর ভিত্তি করে উচ্চ ঝুঁকি।
সরকারের অবস্থানআমানতকারী টাকা পাবেন—এটি সরল হিসাব।বিনিয়োগের পটভূমি ও প্রেক্ষাপট যাচাইযোগ্য।
তদন্তের ক্ষেত্রটাকা ফেরত দেওয়ার পদ্ধতি।কোন তথ্যের ভিত্তিতে বা উদ্দেশ্যে শেয়ার কেনা হয়েছে।

সুশাসন ও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ

মূল্যস্ফীতি প্রসঙ্গে ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন। তিনি মনে করেন, বাজারে ম্যাজিস্ট্রেট পাঠিয়ে বা পরিদর্শক নিয়োগ করে স্থায়ীভাবে ভোগ্যপণ্যের দাম কমানো সম্ভব নয়। বিশ্বের কোনো দেশেই এটি কার্যকর হয়নি। তার মতে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের একমাত্র টেকসই উপায় হলো ‘রাজনৈতিক সুশাসন’। সুশাসন নিশ্চিত না হলে বাজার সিন্ডিকেট দমন করা অসম্ভব।

আঞ্চলিক ও ভূ-রাজনৈতিক প্রসঙ্গে মন্তব্য

ইরান বা নেপালের পক্ষ থেকে নেতিবাচক তুলনা প্রসঙ্গে উপদেষ্টা বলেন, কে কী পটভূমিতে বলেছে তা আমাদের বিবেচ্য বিষয় নয়। বাংলাদেশ ভালো করছে এবং রাজনৈতিক কারণে উন্নয়নের পথে কিছুটা বাঁক বদল আসা স্বাভাবিক। উন্নয়ন কখনো সরলরেখায় চলে না। এছাড়া টিআইবি-র প্রতিবেদন (আমলাতন্ত্রের ক্ষমতা বৃদ্ধি সংক্রান্ত) প্রসঙ্গে তিনি মন্তব্য করেন যে, এ ধরনের আলোচনা সব সময়ই ছিল, কখনো তা বাড়ে আবার কখনো কমে।

সরকারের এই কঠোর অবস্থান মূলত ব্যাংকিং খাতে বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফিরিয়ে আনা এবং ভবিষ্যতে কোনো নিরীক্ষক যাতে অসত্য প্রতিবেদন তৈরি করতে সাহস না পায়, সেই দৃষ্টান্ত স্থাপন করা।