হাড়কাঁপানো শীতে স্থবির জনজীবন: সর্বনিম্ন তাপমাত্রা কিশোরগঞ্জের নিকলীতে

পৌষের মাঝামাঝি এসে দেশজুড়ে জেঁকে বসেছে হাড়কাঁপানো শীত। ঘন কুয়াশার চাদরে ঢাকা পড়েছে আকাশ, যার ফলে গত কয়েক দিন ধরে দেশের অধিকাংশ এলাকায় সূর্যের দেখা মিলছে না। হিমেল বাতাস আর হাড়কাঁপানো ঠান্ডায় বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রা। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের শ্রমজীবী মানুষ এবং হাওর ও পাহাড়ি অঞ্চলের বাসিন্দারা চরম দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন। আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্যমতে, গতকাল দেশের সর্বনিম্ন তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়েছে কিশোরগঞ্জের নিকলীতে, যা ছিল ১০ ডিগ্রি সেলসিয়াস।

হাওর ও শ্রমজীবী মানুষের দুর্ভোগ

কিশোরগঞ্জের নিকলীর হাওরাঞ্চলে এখন বোরো ধান রোপণের ব্যস্ত মৌসুম। কিন্তু তীব্র শীতের কারণে কৃষিশ্রমিকরা মাঠে নামতে পারছেন না। কুর্শা এলাকার ৬৫ বছর বয়সী ফারুক মিয়া জানান, দীর্ঘ জীবনে এমন হাড়কাঁপানো শীত তিনি খুব কমই দেখেছেন। শীতের তীব্রতায় কাজে যেতে না পারায় তাঁর মতো অনেক দিনমজুরের সংসার চালানো দায় হয়ে পড়েছে। একই চিত্র দেখা গেছে মেহেরপুরেও; সেখানকার রিকশাচালক আবদুল মালেক জানান, কনকনে ঠান্ডায় হাত-পা অবশ হয়ে আসায় তিনি রিকশা চালাতে পারছেন না, ফলে পরিবার নিয়ে বিপাকে পড়েছেন।

তাপমাত্রা ও আবহাওয়ার বর্তমান চিত্র

আবহাওয়াবিদদের মতে, আকাশে মেঘ ও কুয়াশার আধিক্য থাকায় দিনের সর্বোচ্চ ও সর্বনিম্ন তাপমাত্রার ব্যবধান কমে এসেছে, যা শীতের অনুভূতিকে বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। সাধারণত ডিসেম্বরে পশ্চিমা লঘুচাপের প্রভাবে বৃষ্টি হয়ে কুয়াশা কেটে যায়, কিন্তু এবার লঘুচাপের অনুপস্থিতিতে কুয়াশা স্থায়ী রূপ নিয়েছে।

একনজরে বিভিন্ন অঞ্চলের আবহাওয়া ও তাপমাত্রার পরিস্থিতি:

অঞ্চলের নামসর্বনিম্ন তাপমাত্রাজনজীবনের ওপর প্রভাব
নিকলী (কিশোরগঞ্জ)১০° সেলসিয়াসমৃদু শৈত্যপ্রবাহ ও কৃষি কাজে স্থবিরতা।
তেঁতুলিয়া (পঞ্চগড়)১২° সেলসিয়াসহিমেল হাওয়া ও সারাদিন কুয়াশার দাপট।
রাজশাহী অঞ্চল১১° – ১২° সেলসিয়াসঠান্ডাজনিত রোগের প্রাদুর্ভাব চরম বৃদ্ধি।
মেহেরপুর ও দক্ষিণ-পশ্চিম১২° – ১৩° সেলসিয়াসশ্রমজীবী মানুষের কর্মহীনতা ও ঘন কুয়াশা।
ঢাকা ও পার্শ্ববর্তী এলাকা১৪° – ১৬° সেলসিয়াসবিমান ও সড়ক যোগাযোগে দৃশ্যমানতা হ্রাস।

বেড়েছে শীতজনিত রোগের প্রকোপ

শীতের তীব্রতা বাড়ার সাথে সাথে দেশের হাসপাতালগুলোতে ঠান্ডাজনিত রোগীর ভিড় বাড়ছে। রাজশাহী ও মেহেরপুর জেনারেল হাসপাতালসহ বিভিন্ন স্বাস্থ্যকেন্দ্রে শিশু ও বয়স্ক রোগীদের ভিড় সামলাতে হিমশিম খাচ্ছেন চিকিৎসকরা। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মতে, এই সময়ে নিউমোনিয়া, শ্বাসকষ্ট, অ্যাজমা এবং ডায়রিয়ায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি।

বিশিষ্ট মেডিসিন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক টিটো মিঞা জানান, তীব্র ঠান্ডায় রক্তনালি সংকুচিত হয়ে ‘ফ্রস্টবাইট’ হওয়ার ঝুঁকি থাকে, বিশেষ করে উত্তরের জেলাগুলোতে বয়স্কদের ক্ষেত্রে এটি বেশি বিপজ্জনক। এই সময়ে শিশু ও বৃদ্ধদের বিশেষ যত্ন নেওয়ার পাশাপাশি পর্যাপ্ত গরম কাপড় ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।

ভবিষ্যৎ পূর্বাভাস ও সতর্কতা

আবহাওয়া অধিদপ্তর জানিয়েছে, ঘন কুয়াশার কারণে আজ ও আগামীকাল দেশের নৌ-পথ, সড়ক এবং বিমান যোগাযোগ ব্যবস্থা সাময়িকভাবে ব্যাহত হতে পারে। তবে আগামী বৃহস্পতিবার থেকে কুয়াশা কিছুটা কমতে শুরু করলে রোদের দেখা মিলতে পারে এবং শীতের তীব্রতা সামান্য হ্রাস পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কুয়াশাচ্ছন্ন রাস্তায় চলাচলের সময় যানবাহনকে অতিরিক্ত সতর্কতা অবলম্বন করার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।