ইউরোপীয় ফুটবলের সফলতম ক্লাব রিয়াল মাদ্রিদ বর্তমানে মাঠের বাইরের এক অনাকাঙ্ক্ষিত ও বিতর্কিত আইনি জটিলতায় জড়িয়ে পড়েছে। ঘটনার মূলে রয়েছেন ক্লাবটির সাবেক পুষ্টিবিদ ইতসিয়ার গনসালেস। কাতার বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার শিরোপা জয়ের নেপথ্যে থাকা এই স্বাস্থ্যবিশেষজ্ঞকে চলতি বছরের মাঝামাঝি সময়ে বরখাস্ত করেছিল রিয়াল। তবে দীর্ঘ নীরবতা ভেঙে তিনি এখন ক্লাবের বিরুদ্ধে কর্মক্ষেত্রে হয়রানি, ষড়যন্ত্র এবং পেশাগত অমর্যাদার অভিযোগ তুলে আদালতের দ্বারস্থ হয়েছেন। এই ঘটনায় রিয়ালের মতো মর্যাদাপূর্ণ ক্লাবের অন্দরমহলের শৃঙ্খলা ও চিকিৎসা বিভাগের পেশাদারিত্ব নিয়ে বিশ্বজুড়ে প্রশ্ন উঠেছে।
আর্জেন্টাইন মহাতারকাদের নেপথ্য কারিগর
ইতসিয়ার গনসালেস সাধারণ কোনো পুষ্টিবিদ নন; তিনি স্নাতকোত্তরসহ মোট আটটি উচ্চতর ডিগ্রিধারী একজন প্রথিতযশা বিশেষজ্ঞ। কাতার বিশ্বকাপে আর্জেন্টিনার চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পেছনে তাঁর বৈজ্ঞানিক ডায়েট ও পুষ্টি পরিকল্পনার বড় অবদান ছিল। বিশেষ করে চারজন বিশ্বজয়ী ফুটবলারের ব্যক্তিগত সাফল্যের রূপকার ছিলেন তিনি:
| খেলোয়াড়ের নাম | জাতীয় দল | সাফল্যের প্রেক্ষাপট |
| মার্কোস আকুনিয়া | আর্জেন্টিনা | ইনজুরি কাটিয়ে বিশ্বকাপের জন্য শতভাগ ফিটনেস অর্জন। |
| গিদো রদ্রিগেস | আর্জেন্টিনা | স্ট্যামিনা বৃদ্ধি ও উচ্চতীব্রতার ম্যাচে সহনশীলতা রক্ষা। |
| হেরমান পেসেলা | আর্জেন্টিনা | শারীরিক সক্ষমতা ও দ্রুত রিকভারি নিশ্চিতকরণ। |
| পাপু গোমেজ | আর্জেন্টিনা | দীর্ঘমেয়াদী ফিটনেস ও ওজনের ভারসাম্য বজায় রাখা। |
রিয়াল মাদ্রিদে ‘শত্রুতাপূর্ণ’ অভিজ্ঞতা
আর্জেন্টাইন তারকাদের অবিশ্বাস্য শারীরিক পরিবর্তনের জাদুকর হিসেবে ইতসিয়ারকে রিয়ালে আনা হলেও সেখানে তাঁর পথচলা ছিল কণ্টকাকীর্ণ। স্প্যানিশ দৈনিক ‘মার্কা’কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানান, রিয়ালের চিকিৎসা ও ফিজিওথেরাপি বিভাগ শুরু থেকেই তাঁর প্রতি চরম শত্রুতাপূর্ণ আচরণ শুরু করে। যদিও তিনি ক্লাবের সভাপতি ফ্লোরেন্তিনো পেরেজের প্রতি গভীর শ্রদ্ধাশীল, কিন্তু অভ্যন্তরীণ মেডিকেল স্টাফদের অসহযোগিতা ও উপহাস ছিল নিত্যদিনের ঘটনা।
ইতসিয়ারের বর্ণনায় ফুটে উঠেছে রিয়ালের চিকিৎসা বিভাগের কিছু অন্ধকার দিক:
কর্মক্ষেত্রে অসহযোগিতা: দানি কারভাহাল বা রদ্রিগোর মতো খেলোয়াড়দের ব্যক্তিগত পুষ্টি নিয়ে কাজ করার সময় অন্য কর্মীরা খেলোয়াড়দের উস্কানি দিতেন যেন তাঁরা ইতসিয়ারের নির্দেশনা না মানেন।
হুমকি ও মানসিক নির্যাতন: তাঁকে প্রায়ই বলা হতো, “বেশি কিছু বদলাতে গেলে চাকরি হারাবেন।” এমনকি তাঁকে সভাপতির কাছে ‘পাগল’ হিসেবে প্রমাণের হুমকিও দেওয়া হয়েছিল।
চুরির মিথ্যা অপবাদ: তাঁর ক্যারিয়ার ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে মেডিকেল সার্ভিসের পক্ষ থেকে দাবি করা হয় যে, তিনি নাকি ক্লাবের ‘সাপ্লিমেন্টের একটি পুরো চালান চুরি করেছেন’। এই বানোয়াট অভিযোগে তিনি এতটাই আতঙ্কিত হয়ে পড়েন যে আজও প্রতি রাতে দুঃস্বপ্ন দেখেন।
বিচার ও মর্যাদার লড়াই
ইতসিয়ার গনসালেস আদালতের শরণাপন্ন হলেও তিনি কোনো আর্থিক ক্ষতিপূরণ বা অর্থের বিনিময়ে আপস করতে চান না। তাঁর স্পষ্ট দাবি—তিনি কোনো টাকা চান না, তিনি কেবল রিয়াল মাদ্রিদ কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে একটি আনুষ্ঠানিক ‘ক্ষমা’ চান। তিনি চান সভাপতি এবং খেলোয়াড়েরা জানুক যে তাঁর সাথে কী ধরণের অমর্যাদাকর আচরণ করা হয়েছে।
এই প্রথিতযশা পুষ্টিবিদ জানান, সত্য প্রকাশ না করা পর্যন্ত তিনি এই বিষাক্ত অধ্যায়টি চিরতরে ভুলে যেতে পারছিলেন না। রিয়াল মাদ্রিদ এই গুরুতর অভিযোগের প্রেক্ষিতে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া জানায়নি। ফুটবল বিশ্ব এখন অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছে ক্লাবের পরবর্তী পদক্ষেপ দেখার জন্য।
