হামে মৃত্যুর শ্রেণিবিভাগে নতুন বিতর্ক

দেশে হামজনিত শিশু মৃত্যুর সংখ্যা ও শ্রেণিবিভাগ ঘিরে নতুন করে বিভ্রান্তি ও বিতর্ক দেখা দিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, হামের উপসর্গ থাকা অবস্থায় কোনো শিশুর মৃত্যু হলে সেটিকে সাধারণভাবে হামে মৃত্যু হিসেবেই গণ্য করা উচিত। তবে স্বাস্থ্য প্রশাসনের সাম্প্রতিক তথ্য উপস্থাপনায় “নিশ্চিত” এবং “সন্দেহজনক”—এই দুই ধরনের শ্রেণিবিভাগ যুক্ত হওয়ায় মৃত্যুর প্রকৃত চিত্র নিয়ে জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি হয়েছে।

চলতি বছর রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে শিশুদের মধ্যে হামে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর সংখ্যা উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে বলে জানা গেছে। কিন্তু কতজন শিশু প্রকৃত অর্থে হামে মারা গেছে, তা নিয়ে বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন পরিসংখ্যান পাওয়া যাচ্ছে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।

একাধিক হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, শুরুতে সংক্রামক রোগ হাসপাতাল ২২ জন শিশুর হামে মৃত্যুর তথ্য জানায়। পরবর্তীতে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সমন্বিত নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র জানায়, সন্দেহজনক হামে মৃত্যু ৩২ জন এবং নিশ্চিত হামে মৃত্যু ২ জন। এরপর সংশোধিত ও সর্বশেষ তথ্যে সন্দেহজনক মৃত্যু ১৯৪ জন এবং নিশ্চিত মৃত্যু ৩৯ জনে পৌঁছায়। সব মিলিয়ে মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়ায় ২৩৩ জন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, যেসব ক্ষেত্রে পরীক্ষাগারে নমুনা বিশ্লেষণের মাধ্যমে সংক্রমণ নিশ্চিত করা গেছে, সেগুলোকে “নিশ্চিত হামে মৃত্যু” হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়েছে। অন্যদিকে, যেসব ক্ষেত্রে পরীক্ষা করা সম্ভব হয়নি বা তথ্য অসম্পূর্ণ ছিল, সেগুলোকে “সন্দেহজনক” হিসেবে ধরা হচ্ছে।

তবে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের একাংশ এই শ্রেণিবিভাগ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। তাদের মতে, হামের ক্ষেত্রে ক্লিনিক্যাল উপসর্গ যেমন জ্বর, শরীরে ফুসকুড়ি, কাশি ও চোখে প্রদাহ উপস্থিত থাকলেই রোগটি শনাক্ত করা যায়। ফলে মৃত্যুর ক্ষেত্রে উপসর্গ উপস্থিত থাকলে সেটিকে আলাদা করে “সন্দেহজনক” বলা অনেক সময় বিভ্রান্তির সৃষ্টি করে।

চলতি বছরের হামে মৃত্যুর শ্রেণিবিভাগ নিচের টেবিলে উপস্থাপন করা হলো—

শ্রেণিমৃত্যুর সংখ্যা
নিশ্চিত হামে মৃত্যু৩৯ জন
সন্দেহজনক হামে মৃত্যু১৯৪ জন
মোট মৃত্যু২৩৩ জন

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, শুধুমাত্র ল্যাব পরীক্ষার ভিত্তিতে সব মৃত্যুকে নিশ্চিত বলা বৈজ্ঞানিকভাবে সঠিক নয়, কারণ অনেক ক্ষেত্রে অন্যান্য সংক্রমণজনিত রোগেও একই ধরনের উপসর্গ দেখা দিতে পারে। তাই তথ্য উপস্থাপনায় বৈজ্ঞানিক মানদণ্ড অনুসরণ করা হচ্ছে বলে তিনি দাবি করেন।

অন্যদিকে, জাতীয় টিকাদান ও রোগ মূল্যায়ন বিষয়ক বিশেষজ্ঞ কমিটির সদস্যরা এক যৌথ মতামতে জানিয়েছেন, হামের উপসর্গ থাকা অবস্থায় মৃত্যু হলে সেটিকে হামের মৃত্যু হিসেবেই বিবেচনা করা উচিত। তাদের মতে, বিভক্ত শ্রেণিবিভাগ জনমনে ভুল ধারণা তৈরি করতে পারে এবং রোগ নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমে বাধা সৃষ্টি করতে পারে।

রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সাবেক এক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা বলেন, তথ্যের স্বচ্ছতা ও একক মানদণ্ড না থাকলে জনআস্থা হ্রাস পায় এবং গুজবের সুযোগ তৈরি হয়। তিনি আরও বলেন, প্রাদুর্ভাবকালীন সময়ে একক ও স্পষ্ট তথ্য প্রদানই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জনস্বাস্থ্য কৌশল।

বিশেষজ্ঞদের মতে, হামের বিস্তার রোধে দ্রুত ও ব্যাপক টিকাদান কর্মসূচি, কার্যকর রোগ শনাক্তকরণ ব্যবস্থা এবং তথ্য ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি মৃত্যুর শ্রেণিবিভাগ নিয়ে একটি অভিন্ন জাতীয় নীতি গ্রহণ করা না হলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠতে পারে।