বাংলাদেশের বৈদেশিক শ্রমবাজারে দীর্ঘদিনের জটিলতা এখন গভীর সংকটে রূপ নিয়েছে। দেশের অর্থনীতির প্রধান ভিত্তি রেমিটেন্স হলেও বিদেশে কর্মী পাঠানোর সক্ষমতা দ্রুত কমছে। একদিকে সিন্ডিকেট, অন্যদিকে নীতিগত অদক্ষতা ও বিদেশি লবিস্টদের চাপ—সব মিলিয়ে বাংলাদেশের শ্রমবাজার কার্যত ধসে পড়ার পথে।
গত ১২ বছরে ওমান, বাহরাইন, লিবিয়া, সুদান, মিসর, মালদ্বীপসহ বহু দেশ শ্রমবাজার সীমিত বা বন্ধ করে দিয়েছে। নতুন বাজার তৈরি না হওয়ায় বাজারের ওপর চাপ বাড়ছে মাত্র পাঁচটি দেশে—সৌদি আরব, কাতার, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কুয়েত ও ওমান। সংযুক্ত আরব আমিরাত ২০২৬ সাল থেকে বাংলাদেশসহ ৯ দেশের বিরুদ্ধে ভিসা নিষেধাজ্ঞা দিতে যাচ্ছে—যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করবে।
Table of Contents
নীতি-ব্যর্থতা ও সিন্ডিকেটের কষাঘাত
সরকারি প্রতিষ্ঠান বোয়েসেলকে অতিরিক্ত ক্ষমতা দেওয়াকে অনেকেই বড় নীতি-ভুল হিসেবে দেখছেন। এতে হাজারো বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সি কার্যত কর্মহীন হয়ে পড়েছে। ফলাফল—বিদেশে কর্মী পাঠানো পাঁচ ভাগের এক ভাগে নেমে এসেছে।
অন্যদিকে ২০০টির বেশি এজেন্সির লাইসেন্স নবায়ন আটকে থাকা অবস্থায় হাজারো ভিসাপ্রাপ্ত কর্মী দেশ ছাড়তে পারছেন না। অনেকের ভিসা মেয়াদ শেষ হওয়ার পথে, ফলে পরিবার নিয়ে দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছেন তারা।
দক্ষতার ঘাটতি: প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে বাংলাদেশ
দক্ষতা উন্নয়নে বাংলাদেশের পিছিয়ে পড়া এখন বড় সমস্যা। দক্ষিণ কোরিয়ার ইপিএস কোটা ১০,৩০০ হলেও পাঠানো গেছে মাত্র ১,৫০০ কর্মী। অপরদিকে নেপাল, ভিয়েতনাম, শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান ও ইন্দোনেশিয়া প্রায় পুরো কোটা পূরণ করেছে।
নারী কর্মী প্রবাসে যাওয়া ২০১৬ সালের তুলনায় কমেছে ৬৬ শতাংশ—যা শ্রমবাজার সংকোচনের আরেকটি স্পষ্ট ইঙ্গিত।
জটিল প্রশাসনিক ব্যবস্থা শ্রমিকদের দুর্ভোগ বাড়াচ্ছে
ওয়ান–স্টপ সার্ভিস বন্ধ হওয়ায় বিদেশ যাওয়ার প্রক্রিয়া আরও ধীর ও ব্যয়বহুল হয়েছে। রিক্রুটিং এজেন্সিগুলো অতিরিক্ত সার্ভিস চার্জ আদায় করছে। সৌদিগামী কর্মীদের বহির্গমন ছাড়পত্র কঠোর হওয়ায় কর্মী পাঠানো কমছে।
বাংলাদেশি মিশনগুলোর দুর্বলতাও শ্রমবাজার সংকোচনের অন্যতম কারণ। পাসপোর্ট নবায়নসহ প্রায় সব সেবায় প্রবাসীরা হয়রানির শিকার হচ্ছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতামত
রামরুর প্রতিষ্ঠাতা ড. তাসনিম সিদ্দিকী বলেন—
“শ্রমবাজার মাত্র ১০-১১টি দেশে সীমাবদ্ধ হওয়া অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। নতুন বাজার না খুললে কর্মসংস্থানে ধস নামবে।”
অভিবাসন বিশেষজ্ঞ আসিফ মুনির বলেন—
“সিন্ডিকেট ভাঙা না গেলে অভিবাসন ব্যয় ও সংকট দুইই বাড়বে।”
বায়রার সাবেক যুগ্ম মহাসচিব ফখরুল ইসলাম বলেন—
“সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণে না আনলে শ্রমবাজার ভয়াবহ অবস্থায় পৌঁছাবে।”
সমাধানের জন্য প্রয়োজন চারটি পদক্ষেপ
সিন্ডিকেট ভেঙে স্বচ্ছ প্রতিযোগিতা প্রতিষ্ঠা
দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচি জোরদার
নতুন দেশভিত্তিক শ্রমবাজার খোলা
আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও দুর্নীতি কমানো
বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব পদক্ষেপ দ্রুত বাস্তবায়ন করা না হলে রেমিটেন্স আয়, বৈদেশিক কর্মসংস্থান এবং দেশের অর্থনীতি—সবই বড় ধরনের ঝুঁকিতে পড়বে।
