সারা দেশে বেড়েছে প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যাকাণ্ড, নিয়ন্ত্রণে হিমশিম আইনশৃঙ্খলা বাহিনী

রাজধানীর জুরাইনে সিএনজিচালিত অটোরিকশা চালক পাপ্পু শেখ (২৮) সোমবার সন্ধ্যায় বাসা থেকে বের হওয়ার shortly পর কনকর্ড স্কুলের সামনে গুলি করে হত্যা করা হয়। আহত হন আরও একজন। পরিবারের দাবি, কানা জব্বারের ছেলে বাপ্পা, কানচি এবং আরও কয়েকজন চিহ্নিত সন্ত্রাসী এ ঘটনাটি ঘটিয়েছে। কয়েকদিন আগে বাপ্পার ভাতিজা হিমেলের সঙ্গে পাপ্পুর ঝগড়ার জেরেই হত্যাকাণ্ড হয়েছে বলে তারা মনে করেন। র‌্যাব-১০ এই ঘটনায় জড়িত দুইজনকে গ্রেপ্তার করেছে।

এর আগের দিন খুলনা আদালতপাড়ায় হাজিরা শেষে মোটরসাইকেলে বসে থাকা হাসিব হাওলাদার (৪০) ও ফজলে রাব্বি রাজনকে (৩৫) প্রকাশ্যে গুলি করে হত্যা করা হয়। পরে তাদের কুপিয়ে মৃত্যু নিশ্চিত করে খুনিরা। নিহত দুজনই পলাশ গ্রুপের সহযোগী ছিলেন। গোয়েন্দা সূত্র বলছে, গ্রেনেড বাবু এই ঘটনার সঙ্গে জড়িত।

সাম্প্রতিক সময়ে জুরাইন ও খুলনাসহ সারা দেশে প্রকাশ্য হত্যাকাণ্ড বেড়েছে। আধিপত্য বিস্তার, রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব, চাঁদাবাজি, পুরোনো বিরোধসহ নানা কারণে সন্ত্রাসীরা প্রকাশ্যে গুলি করছে। আদালতপাড়া মতো নিরাপদ স্থানে হত্যাকাণ্ড সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক বাড়িয়েছে। গত মাসেই ঢাকার আদালতপাড়ায় এক সন্ত্রাসীকে হত্যা করা হয়।

দেশে অবৈধ অস্ত্রের বিস্তার বাড়ায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়েছে। গণ-অভ্যুত্থানের পর পুলিশি দুর্বলতার সুযোগে বিভিন্ন থানায় হামলা চালিয়ে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র লুট হয়। গণভবনে এসএসএফ সদস্যদের অস্ত্রও লুট হয়েছিল। এসব অস্ত্রের অনেকটাই উদ্ধার হয়নি।

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, তখন ৫ হাজার ৭৫০টি অস্ত্র লুট হয়েছিল। উদ্ধার হয়েছে ৪ হাজার ৪০৮টি; এখনো হাজারের বেশি অস্ত্র রয়েছে নিখোঁজ। এসএমজি, অ্যাসল্ট রাইফেল, স্নাইপার রাইফেল ও এলএমজিসহ ভয়ংকর অস্ত্র রয়েছে এতে। গোলাবারুদও লুট হয়েছিল, যা উদ্ধার অসম্পূর্ণ। এসব অস্ত্র এখন সন্ত্রাসী, জঙ্গি ও চরমপন্থিদের হাতে রয়েছে বলে গোয়েন্দাদের ধারণা।

অন্যদিকে দেশের সীমান্ত দিয়ে ১৮ থেকে ৩০টি পয়েন্ট হয়ে আগ্নেয়াস্ত্র ঢুকছে। নজরদারি বাড়লে চোরাচালানকারীরা রুট পরিবর্তন করে।

সাম্প্রতিক হত্যার মধ্যে রয়েছে—পুরান ঢাকায় সন্ত্রাসী তারেক সাইদ মামুনকে হত্যা; লক্ষ্মীপুরে বিএনপি নেতা আবুল কালামকে হত্যা; রাজধানীর পল্লবীতে যুবদল নেতাকে হত্যা; আরেক ঘটনায় পল্লবীতে হার্ডওয়্যার দোকানে ঢুকে গোলাম কিবরিয়াকে হত্যা; চট্টগ্রামে বিএনপি সমর্থিত এক ব্যবসায়ীকে হত্যা।

গোয়েন্দা তথ্য বলছে, আন্ডারওয়ার্ল্ডের মাফিয়া ইমন ব্যাংকক থেকে আজিজ মোহাম্মদ ভাইয়ের ডেরায় বসে ঢাকার অপরাধ জগত নিয়ন্ত্রণ করছে। জোসেফ আন্ডারওয়ার্ল্ডে সক্রিয়। সানজিদুল ইসলাম ইমন মালয়েশিয়া থেকে ধানমণ্ডি, নিউমার্কেট, এলিফ্যান্ট রোড ও হাজারীবাগে সন্ত্রাসী বাহিনী পরিচালনা করছে। পিচ্চি হেলাল দেশ ছাড়ায় মোহাম্মদপুরের নিয়ন্ত্রণ ইমনের হাতে গেছে। জিসান গ্রুপ ক্লাবপাড়া, মতিঝিল, খিলগাঁওসহ বিভিন্ন এলাকায় প্রভাব বিস্তার করছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও অপরাধ বিশ্লেষক ড. তৌহিদুল হক গণমাধ্যমকে বলেন, একই ধরনের অপরাধ যখন বারবার ঘটে তখন বোঝা যায় নিয়ন্ত্রণ দুর্বল। তিনি তিনটি কারণ উল্লেখ করেন—লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধার না হওয়া, বাতিল লাইসেন্সধারী অস্ত্র থানায় জমা না দেওয়া এবং সীমান্ত দিয়ে অবৈধ অস্ত্রের প্রবেশ। এছাড়া কারাগার ভেঙে পালানো ও জামিনে মুক্ত সন্ত্রাসীদের ওপর নজরদারি অপর্যাপ্ত। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে অনেক সময় ব্যবস্থা নিতে দ্বিধাগ্রস্ত হয়।

নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর (অব.) এমদাদুল ইসলাম গণমাধ্যমকে বলেন, এটি জাতীয় ও রাজনৈতিক সমস্যা; রাজনৈতিক কমিটমেন্ট ছাড়া সন্ত্রাস দমন সম্ভব নয়। শুধুমাত্র আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দিয়ে সমাধান হবে না।

জিলাইভ২৪/এসএস