না পরিবহনের মালিক এনায়েত উল্লাহর বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিং মামলা

বাংলাদেশের পরিবহন খাতের বহুদিনের অন্ধকার ‘চাঁদা অর্থনীতি’ আবারও সামনে আসলো এনা পরিবহনের মালিক ও পরিবহন মালিক সমিতির সাবেক নেতা খন্দকার এনায়েত উল্লাহর বিরুদ্ধে সিআইডির মানি লন্ডারিং মামলার মধ্য দিয়ে। অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছে ১০৭ কোটি টাকার চাঁদাবাজি এবং তা ধোয়ার জন্য জটিল ব্যাংক লেনদেনের এক বিশাল আর্থিক নেটওয়ার্ক।

সিআইডি জানায়, এনায়েত উল্লাহর পরিবার-স্বজনদের নামে খোলা ১৯৯টি ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে তিনি ২,১৩১ কোটি টাকা লেনদেন করেছেন, যা দেশের পরিবহন ব্যবসার স্বাভাবিক আয়ের সঙ্গে কোনোভাবেই সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তদন্তকারীদের ভাষ্য—এটি ছিল দীর্ঘ সময় ধরে গড়ে ওঠা এক ‘প্যারালাল ফিনান্সিয়াল সিস্টেম’, যার মাধ্যমে অর্থপাচার ও অবৈধ অর্থ বৈধ করার প্রক্রিয়া চলত।

মঙ্গলবার রমনা থানায় মামলা করার পর বুধবার সিআইডি আনুষ্ঠানিকভাবে বিষয়টি জানায়। মামলার নথি অনুযায়ী, চাঁদাবাজির অর্থ বিভিন্ন ব্যাংকে ছোট ছোট অঙ্কে জমা করা, পরে আবার অন্য হিসাবে স্থানান্তর করা—এসবই ছিল মানি লন্ডারিংয়ের ক্লাসিক ‘স্ট্রাকচারিং’ ও ‘লেয়ারিং’ কৌশল। আদালত ইতিমধ্যে ধানমন্ডির দুটি ফ্ল্যাট এবং রূপগঞ্জের দুটি প্লট জব্দ করেছে; ফ্রিজ করা হয়েছে ৫৩টি ব্যাংক হিসাব

পরিবহন মালিক সমিতি: নেতৃত্ব না ক্ষমতার দুর্গ?

এনায়েত উল্লাহর উত্থানের গল্প পরিবহন শিল্পের সাংগঠনিক শক্তি, রাজনৈতিক যোগসূত্র এবং অঘোষিত অর্থনৈতিক প্রবাহের জটিলতা তুলে ধরে। আশির দশকে একটি মাত্র পুরোনো বাস থেকে শুরু হলেও অল্প সময়ের মধ্যে তিনি হয়ে ওঠেন বড় মালিক।

এর পরপরই রাজনীতিতে প্রবেশ—প্রথমে বিএনপি, পরে আওয়ামী লীগের দক্ষিণ শাখার সহসভাপতি। ২০০৮ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর তাঁর প্রভাব বহুগুণ বাড়তে থাকে। টানা ১৬ বছর ধরে দু’টি জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ পরিবহন সংগঠনের শীর্ষ পদে থাকা—যা আগে কেউ এত দীর্ঘ সময় ধরে দখলে রাখতে পারেননি।

সিআইডির ভাষ্য অনুযায়ী, এই রাজনৈতিক ও সংগঠনিক প্রভাব তাঁকে ‘অস্পৃশ্য শক্তি’তে পরিণত করে। পরিবহন খাতে নতুন বাস নামাতে হলে মালিকদের ২–৫ লাখ টাকা দিতে হতো। শুধু তাই নয়, বাস কেনার সময় একটি অংশ তাঁকে দিতে বাধ্য করা হতো; না দিলে বাস চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হতো। পরিবহন ব্যবসায়ীদের অভিযোগ বহু বছর ধরেই ছিল, কিন্তু কার্যকর তদন্ত কখনও হয়নি।

পরিবহন খাতের অঘোষিত অর্থনীতি উন্মোচন

এই মামলার মধ্য দিয়ে পরিবহন খাতের দীর্ঘদিনের ‘কালো অর্থনৈতিক কাঠামো’ কার্যত প্রকাশ্যে এসেছে। হাজার হাজার কোটি টাকার অপ্রদর্শিত লেনদেন, রাজনৈতিক ক্ষমতার পেছনে নিরাপত্তা, সংগঠনের প্রভাব—সব মিলিয়ে এটি ছিল এক প্রাতিষ্ঠানিক চাঁদাবাজির যন্ত্র।

এখন মামলার তদন্ত ও বিচার কী দিকে যায়—তা শুধু পরিবহন খাত নয়, দেশের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কাঠামোর জন্যও গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার মুহূর্ত হয়ে দাঁড়িয়েছে।