ভূমিকম্পে ঝুঁকিপূর্ণ রংপুর—অবকাঠামোতে নেই নিরাপত্তা

২০১৬ সালের ২৫ এপ্রিল দুপুরে উৎসে রিখটার স্কেলে ৭ দশমিক ৫ মাত্রার ভূমিকম্প হয়, যা ২৫ থেকে ৩০ সেকেন্ড স্থায়ী ছিল। সেদিন ভয়ে রংপুরের মানুষ বাসা-বাড়ি, অফিস ও দোকানপাট ছেড়ে রাস্তা ও খোলা স্থানে আশ্রয় নেন।

এর আগে একই বছরের ৫ জানুয়ারি ভোরে দুই দফায় ৬ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্পে কেঁপে ওঠে রংপুর নগরী। ২০১১ সালের ১৮ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যা ৬টা ৪১ মিনিটে প্রায় সোয়া মিনিট স্থায়ী আরেকটি কম্পন হয়, যার মাত্রা ছিল ৬ দশমিক ৮।

সর্বশেষ গতকাল শুক্রবার (২১ নভেম্বর) ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল বাংলাদেশের নরসিংদির ঘোরাশাল এলাকা, যা রংপুরেও আতঙ্কের কারণ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।

রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল ও পরিবেশ বিজ্ঞান বিভাগের প্রধান মোস্তাফিজুর রহমান গণমাধ্যমকে বলেন, বাংলাদেশকে ভূকম্পনের তিনটি জোনে ভাগ করা হয়েছে। এর মধ্যে সিলেট এক নম্বরে এবং দ্বিতীয় স্থানে রংপুর। বিশেষ করে যমুনার উপারের মধুপুর ফল্ট ও শিলং ফল্টের মাঝামাঝি অবস্থান হওয়ায় রংপুর বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে।

তিনি আরও বলেন, ১৮ শতকের শেষের দিকে রংপুরের চিলমারীতে সাড়ে আট মাত্রার ভূমিকম্প হয়েছিল, যার ফলে যমুনা নদীর উৎপত্তি। গত ২১ বছরে রংপুর অঞ্চলে ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল না। ভবিষ্যতে এ অঞ্চলে উৎপত্তিস্থল হলে তা সাত মাত্রার বেশি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এই অঞ্চলে ভূমিকম্পের বড় কারণ হলো ভূগর্ভস্থ পানির স্তর আশঙ্কাজনকভাবে নিচে নেমে যাওয়া।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২৯ বছর আগে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় রংপুরকে ভূমিকম্পের রেড জোন ঘোষণা করে। এরপর থেকে কার্যকর কোনো উদ্যোগ চোখে পড়েনি।

আবহাওয়া অফিস জানায়, ২০০৯ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের ২১ নভেম্বর পর্যন্ত এই অঞ্চলে ১৮৫ বার ভূমিকম্প হয়েছে। ২০০৭ সালে ২৫ বার এবং ২০০৮ সালে ৪০ বার ভূমিকম্প রেকর্ড হয়। ২০০৯ সালের আগস্টে পাঁচবার ও সেপ্টেম্বরে তিনবার কম্পন হয়। ২০১০ সালের সেপ্টেম্বরে দুইবার ভূমিকম্প হয়। ২০২০ সালে ৭৪ বার কম্পন রেকর্ড হয়—এর মধ্যে ৩ থেকে ৪ মাত্রার ৩৫ বার, ৪ থেকে ৫ মাত্রার ৩৩ বার এবং ৫ থেকে ৬ মাত্রার কম্পন ৬ বার।

২০২১ সালের ৬ এপ্রিল রাত ৯টা ২০ মিনিটে রংপুরসহ আশপাশের কয়েকটি জেলায় তিন সেকেন্ড স্থায়ী ৫ দশমিক ১ মাত্রার ভূকম্পন অনুভূত হয়, যার উৎপত্তিস্থল ছিল ভুটানের ছ্যামছি এলাকা। ২০২৫ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি রংপুরের বদরগঞ্জে ২ দশমিক ৯ এবং কুড়িগ্রামের ভুরুঙ্গামারীতে ২ দশমিক ৪ মাত্রার ভূকম্পন রেকর্ড হয়।

এদিকে রংপুরকে রেড জোন ঘোষণা করা হলেও ভূমিকম্প থেকে সুরক্ষায় কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়নি। বরং নগরীতে বিল্ডিং কোড না মেনে দ্রুতগতিতে বহুতল ভবন গড়ে উঠছে। সরকারি পরিত্যক্ত ভবনেও চলমান রয়েছে কার্যক্রম।

জানা গেছে, ২০১৬ সালে রংপুর নগর ভবন ৪৭টি সরকারি ভবনকে পরিত্যক্ত তালিকাভুক্ত করে—যার মধ্যে জেলা প্রশাসক ভবন, পুলিশ সুপার কার্যালয়, ট্রেজারি ভবন, পুরাতন সার্কিট হাউজসহ আরও কয়েকটি স্থাপনা রয়েছে। অধিকাংশ ভবনই সাময়িক সংস্কার করে ব্যবহার করা হচ্ছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র আরও জানায়, ২০২০ সালে রংপুর সেনানিবাসে সেনাবাহিনীর উদ্যোগে তিন দিনের বৈঠক হয় রংপুর শহরে ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলা ও উদ্ধার প্রস্তুতি নির্ধারণে। সিটি মেয়র, জেলা প্রশাসন, পুলিশ, ফায়ার সার্ভিস ও বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের কর্মকর্তারা ওই বৈঠকে অংশ নিয়ে সুপারিশ পাঠান সরকারের উচ্চ দপ্তরে, কিন্তু তার অগ্রগতি সম্পর্কে কেউ কিছু জানে না।

রংপুর ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্সের উপপরিচালক (ভারপ্রাপ্ত) বাদশা মাসুদ আলম গণমাধ্যমকে বলেন, ভৌগোলিক কারণে হিমালয় খুব কাছে হওয়ায় এ অঞ্চল ঝুঁকিপূর্ণ। ৬ মাত্রার বেশি কম্পন হলে বড় ধরনের দুর্ঘটনার আশঙ্কা রয়েছে। প্রয়োজনীয় অনেক উপকরণে সংকট আছে। ভূমিকম্পসহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় জনসচেতনতা বৃদ্ধির কাজ নিয়মিত চলছে।

 

এসএস