অস্ট্রেলিয়ার বিধ্বংসী ব্যাটার জ্যাক ফ্রেজার-ম্যাকগার্ক আবারও নিজের ব্যাটিং-সামর্থ্যের প্রমাণ দিলেন। কুইন্সল্যান্ডের বোলারদের বিপক্ষে চার-ছক্কার ঝড় তুলে মাত্র ১৪ বলে অর্ধশতক এবং ৪৯ বলে শতরান পূর্ণ করেছেন দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ার এই ডানহাতি ব্যাটার। এর মধ্য দিয়ে অস্ট্রেলিয়ার ঘরোয়া এক দিনের ক্রিকেটে নিজের গড়া দ্রুততম ফিফটির রেকর্ড ভেঙেছেন তিনি। তাঁর অসাধারণ ইনিংসের ওপর ভর করে বড় সংগ্রহ গড়েছে দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়া, পেয়েছে ১২৬ রানের জয়ও।
অ্যাডিলেইডের ক্যারেন রল্টন ওভালে কুইন্সল্যান্ডের বিপক্ষে ৬৩ বলে ১২২ রান করেন ম্যাকগার্ক। তাঁর ইনিংসে ছিল ১০টি চার ও ৯টি ছক্কা। লিস্ট ‘এ’ ক্রিকেটে এটি তাঁর দ্বিতীয় সেঞ্চুরি। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত আক্রমণাত্মক ব্যাটিং করে প্রতিপক্ষের বোলারদের চাপে রাখেন তিনি। দ্রুত রান তোলার পাশাপাশি বড় শট খেলার ক্ষমতা দিয়ে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের দিকে নিয়ে আসেন এই ব্যাটার।
ম্যাকগার্কের ইনিংসের সবচেয়ে আলোচিত দিক তাঁর অবিশ্বাস্য গতিতে অর্ধশতক পূর্ণ করা। ২০২৩ সালে ১৮ বলে ফিফটি করে অস্ট্রেলিয়ার ঘরোয়া এক দিনের ক্রিকেটে দ্রুততম অর্ধশতকের রেকর্ড গড়েছিলেন তিনি। এবার নিজের সেই রেকর্ড ভাঙতে খেলেছেন মাত্র ১৪ বল। অর্থাৎ, আগের কীর্তির চেয়ে চার বল কম খেলেই নতুন রেকর্ড গড়েছেন।
লিস্ট ‘এ’ ক্রিকেটে দ্রুততম অর্ধশতকের বৈশ্বিক তালিকাতেও জায়গা করে নিয়েছেন ম্যাকগার্ক। ১১ বলে ফিফটি করে শীর্ষে রয়েছেন ভারতের বৈভব সূর্যবংশী। ১৪ বলে অর্ধশতক করে ম্যাকগার্ক এই তালিকায় যৌথভাবে চতুর্থ স্থানে রয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ইনিংসের শুরু থেকেই চার-ছক্কার ঝড়
ম্যাকগার্কের আক্রমণাত্মক ব্যাটিং শুরু হয় ইনিংসের দ্বিতীয় ওভারেই। টম স্ট্রেকারের ওভারে ২২ রান তুলে কুইন্সল্যান্ডের বোলারদের ওপর চাপ সৃষ্টি করেন তিনি। চতুর্থ ওভারে টম হুইটনির বলে নেন ১৬ রান। প্রথম থেকেই তাঁর ব্যাটিংয়ে ছিল দ্রুত রান তোলার তাগিদ। বোলারদের সামান্য ভুলের সুযোগও কাজে লাগিয়েছেন নিখুঁতভাবে।
ষষ্ঠ ওভারে হেইডেন কেরের বলে চার ও ছক্কা মেরে মাত্র ১৪ বলে ফিফটি পূর্ণ করেন ম্যাকগার্ক। এরপরও তাঁর ব্যাট থামেনি। পরের আট বলে চারটি চার ও একটি ছক্কা হাঁকিয়ে পৌঁছে যান ৭৫ রানে। এই পর্যায়ে তাঁর ব্যাটিংয়ের গতি দেখে দ্রুততম সেঞ্চুরির বিশ্বরেকর্ড ভাঙার সম্ভাবনাও তৈরি হয়েছিল।
তবে কুইন্সল্যান্ডের অধিনায়ক মিচেল সোয়েপসনের নিয়ন্ত্রিত বোলিংয়ে পরবর্তী সময়ে কিছুটা গতি কমে আসে তাঁর। শেষ পর্যন্ত ৪৯ বলে সেঞ্চুরি পূর্ণ করেন ম্যাকগার্ক। টম হুইটনির বলে টানা দুটি ছক্কা হাঁকিয়ে শতরানের মাইলফলকে পৌঁছান তিনি। ৬৩ বলে ১২২ রান করে তাঁর ইনিংস শেষ হয়।
২৯ বলে সেঞ্চুরির বিশ্বরেকর্ড ম্যাকগার্কের
লিস্ট ‘এ’ ক্রিকেটে দ্রুততম সেঞ্চুরির বিশ্বরেকর্ডও ম্যাকগার্কের দখলে। ২০২৩ সালে তাসমানিয়ার বিপক্ষে দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ার হয়ে মাত্র ২৯ বলে শতরান পূর্ণ করেছিলেন তিনি। এর মধ্য দিয়ে ভেঙে দিয়েছিলেন দক্ষিণ আফ্রিকার কিংবদন্তি ব্যাটার এবি ডি ভিলিয়ার্সের রেকর্ড। ২০১৫ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ৩১ বলে সেঞ্চুরি করেছিলেন ডি ভিলিয়ার্স।
সীমিত ওভারের ক্রিকেটে দ্রুত রান তোলার ক্ষেত্রে ম্যাকগার্কের আগ্রাসী ব্যাটিং তাঁকে আলাদা পরিচিতি দিয়েছে। তাঁর ব্যাটিংয়ের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, ইনিংসের শুরু থেকেই বোলারদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা এবং সুযোগ পেলেই বাউন্ডারি আদায় করা। কুইন্সল্যান্ডের বিপক্ষে এই ইনিংসেও সেই প্রবণতা স্পষ্ট ছিল।
তবে এবার ২৯ বলে সেঞ্চুরির নিজের বিশ্বরেকর্ড ভাঙতে পারেননি তিনি। দ্রুততম ফিফটির নতুন কীর্তি গড়লেও শতরানে পৌঁছাতে তাঁকে খেলতে হয়েছে ৪৯ বল। তারপরও ৬৩ বলে ১২২ রানের ইনিংসটি ম্যাচের ফল নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
ম্যাকসুইনির সেঞ্চুরি, জনসনের পাঁচ উইকেট
ম্যাকগার্কের রেকর্ডময় ইনিংসের পাশাপাশি দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ার অধিনায়ক নাথান ম্যাকসুইনিও ব্যাট হাতে দারুণ অবদান রাখেন। তাঁর ব্যাট থেকে আসে ১০৬ রান। দুই ব্যাটারের সেঞ্চুরিতে ভর করে নির্ধারিত ওভার শেষে ৭ উইকেটে ৩৯৭ রানের বিশাল সংগ্রহ গড়ে দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়া।
প্রায় ৪০০ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে কুইন্সল্যান্ডও পাল্টা লড়াইয়ের চেষ্টা করে। দলের হয়ে ল্যাকলান হার্ন ১২১ রানের সেঞ্চুরি করেন। তাঁর ইনিংস কুইন্সল্যান্ডের রান তোলার গতি ধরে রাখতে সাহায্য করলেও অন্য প্রান্তে প্রয়োজনীয় সমর্থনের অভাবে দলকে জয়ের কাছাকাছি নেওয়া সম্ভব হয়নি।
শেষ পর্যন্ত ২৭১ রানে থেমে যায় কুইন্সল্যান্ডের ইনিংস। দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ার পেসার স্পেনসার জনসন বল হাতে দুর্দান্ত পারফরম্যান্স দেখিয়ে পাঁচটি উইকেট তুলে নেন। তাঁর বোলিং প্রতিপক্ষের রান তাড়ায় বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। ফলে ১২৬ রানের ব্যবধানে জয় পায় দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়া।
ম্যাচটিতে দক্ষিণ অস্ট্রেলিয়ার সাফল্যের পেছনে ব্যাটিং ও বোলিং—দুই বিভাগেই ছিল কার্যকর অবদান। ম্যাকগার্ক ও ম্যাকসুইনির সেঞ্চুরি দলকে বড় সংগ্রহ এনে দেয়, আর জনসনের পাঁচ উইকেট নিশ্চিত করে বড় জয়। তবে রেকর্ডের বিচারে দিনটি সবচেয়ে বেশি স্মরণীয় হয়ে থাকবে ম্যাকগার্কের জন্য। মাত্র ১৪ বলে ফিফটি, ৪৯ বলে সেঞ্চুরি এবং ৬৩ বলে ১২২ রান—এক ইনিংসেই নিজের বিধ্বংসী ব্যাটিংয়ের আরেকটি দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন তিনি।









