খবরওয়ালা ডেস্ক
প্রকাশ: ৪ই আগস্ট ২০২৬, ২:৪২ পিএম

বাংলাদেশে হামের প্রাদুর্ভাব জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় ধরনের উদ্বেগ তৈরি করার পাশাপাশি আক্রান্ত পরিবারগুলোর ওপর তীব্র আর্থিক চাপও সৃষ্টি করেছে। অসুস্থ স্বজনের চিকিৎসা নিশ্চিত করতে গিয়ে বহু পরিবারকে ধারদেনা করতে হয়েছে, কেউ ভেঙেছেন দীর্ঘদিনের সঞ্চয়, আবার কেউ সম্পদ বিক্রি করেও ব্যয় মেটানোর চেষ্টা করেছেন। ফলে হাম এখন শুধু একটি সংক্রামক রোগের সমস্যা নয়; এর প্রভাব অনেক পরিবারের জীবনে আর্থিক অনিশ্চয়তা ও সামাজিক সংকটও তৈরি করছে।
বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি (বিডিআরসিএস) এবং ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন অব রেড ক্রস অ্যান্ড রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটিজ (আইএফআরসি) পরিচালিত এক মূল্যায়ন জরিপে এই চিত্র উঠে এসেছে। গত ৩ জুলাই প্রকাশিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, দেশের ১২টি সরকারি মেডিকেল কলেজ ও জেলা হাসপাতালে চিকিৎসা নেওয়া ২ হাজার ৭৪৬টি পরিবারের ওপর জরিপটি পরিচালিত হয়। হামের প্রাদুর্ভাবের সামাজিক ও অর্থনৈতিক প্রভাব বোঝার পাশাপাশি আক্রান্ত পরিবারগুলোর জরুরি প্রয়োজন চিহ্নিত করাই ছিল এই মূল্যায়নের উদ্দেশ্য।
জরিপের সবচেয়ে উদ্বেগজনক তথ্যগুলোর একটি হলো, হামে আক্রান্ত রোগীর চিকিৎসা ও সংশ্লিষ্ট ব্যয় বহন করতে ৮৯ শতাংশ পরিবারকে ঋণ নিতে হয়েছে। একই সময়ে ৬১ শতাংশ পরিবার চিকিৎসার খরচ জোগাতে নিজেদের সঞ্চয় ব্যবহার করেছে। অর্থাৎ, রোগীর চিকিৎসা নিশ্চিত করতে গিয়ে বিপুলসংখ্যক পরিবারকে ভবিষ্যতের আর্থিক নিরাপত্তার জন্য জমিয়ে রাখা অর্থও খরচ করতে হয়েছে। সীমিত আয়ের পরিবারের ক্ষেত্রে এই পরিস্থিতি তাদের দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক স্থিতিশীলতাকে আরও নাজুক করে তুলতে পারে।
জরিপে অংশ নেওয়া রোগীদের বড় অংশই ছিল শিশু। মোট রোগীর ৭৫ শতাংশের বয়স চার বছরের নিচে। ৫ থেকে ১৭ বছর বয়সী রোগীর হার ১৯ শতাংশ এবং ১৮ বছরের বেশি বয়সীদের হার ৬ শতাংশ। এই পরিসংখ্যান থেকে বোঝা যায়, হামের প্রাদুর্ভাবের সবচেয়ে বড় চাপ পড়েছে ছোট শিশুদের পরিবারগুলোর ওপর। শিশুকে হাসপাতালে ভর্তি করা বা চিকিৎসার জন্য দূরে নিয়ে যাওয়ার পর পরিবারের একজন বা একাধিক সদস্যকে দীর্ঘ সময় তার পাশে থাকতে হয়। এতে চিকিৎসা ব্যয়ের পাশাপাশি কর্মঘণ্টা নষ্ট হওয়া, আয় কমে যাওয়া কিংবা কাজ হারানোর ঝুঁকিও তৈরি হয়।
জরিপ অনুযায়ী, চিকিৎসা ও সংশ্লিষ্ট খাতে প্রতিটি পরিবারকে গড়ে ১৬ হাজার টাকা ব্যয় করতে হয়েছে। সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা বিনামূল্যে বা তুলনামূলক কম খরচে পাওয়া গেলেও রোগীকে হাসপাতালে পৌঁছে দেওয়া, যাতায়াত, খাবার, পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক ব্যয় অনেক পরিবারের জন্য বড় বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ৪ শতাংশ পরিবারকে ব্যয় মেটাতে নিজেদের সম্পদ বিক্রি করতে হয়েছে। প্রায় ৩ শতাংশ পরিবারকে আবার অনুদানের ওপর নির্ভর করতে হয়েছে।
পেশাগত তথ্য দেওয়া পরিবারগুলোর ৭৮ শতাংশই অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত। এসব পরিবারের মাসিক আয় ছিল ৬ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকার মধ্যে। এই আয়ের তুলনায় চিকিৎসা ও আনুষঙ্গিক খরচের পরিমাণ অনেক বেশি হওয়ায় তাদের জন্য আর্থিক সংকট সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে দিনমজুর, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী বা অনানুষ্ঠানিক খাতের কর্মীদের ক্ষেত্রে হাসপাতালে রোগীর সঙ্গে অবস্থান করার অর্থ অনেক সময় দিনের আয় হারানো। কোনো কোনো পরিবারের ক্ষেত্রে এই অনুপস্থিতি চাকরি বা কাজ হারানোর কারণও হয়েছে।
রংপুরের হাজেরা খাতুনের অভিজ্ঞতা এই বাস্তবতারই একটি উদাহরণ। গত জুনে ১১ মাস বয়সী মেয়েকে চিকিৎসার জন্য ঢাকার শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে আসেন তিনি। তার ভাষ্য অনুযায়ী, মেয়ের চিকিৎসায় এরই মধ্যে ৭০ হাজার টাকার বেশি ব্যয় হয়েছে। সরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা পেলেও রোগীকে ঢাকায় আনা, খাবার, পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় খরচ পরিবারকেই বহন করতে হয়েছে। শুধু অ্যাম্বুলেন্সে করে ঢাকায় আসতেই তার প্রায় ২০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। পরিস্থিতি সামাল দিতে আত্মীয়-স্বজনের কাছ থেকেও তাকে টাকা ধার করতে হয়েছে। তার স্বামী সৌদি আরবে কর্মরত থাকলেও সংশ্লিষ্ট সময়ে বেতন না পাওয়ায় পরিবারের আর্থিক সংকট আরও গভীর হয়েছে।
জরিপে অংশ নেওয়া প্রতিটি পরিবারই বর্তমান পরিস্থিতি মোকাবিলায় আর্থিক সহায়তার প্রয়োজনের কথা জানিয়েছে। জরুরি প্রয়োজনের তালিকায় ৩৫ শতাংশ পরিবার ওষুধকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছে। ৩৩ শতাংশ পরিবার পানি, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধি-সংক্রান্ত সহায়তার কথা জানিয়েছে। অন্যদিকে, ২২ শতাংশ পরিবার খাদ্য সহায়তাকে জরুরি বলে উল্লেখ করেছে। এসব তথ্য থেকে স্পষ্ট, হামের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় শুধু হাসপাতালভিত্তিক চিকিৎসা যথেষ্ট নয়; আক্রান্ত পরিবারগুলোর দৈনন্দিন জীবনধারণের প্রয়োজনও বিবেচনায় নিতে হচ্ছে।
জরিপের ফলাফলের ভিত্তিতে ঝুঁকির মানদণ্ড নির্ধারণ করে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত ২ হাজার ৪০০ পরিবারকে জরুরি নগদ সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনা করা হয়েছে। প্রতিটি পরিবারকে ১০ হাজার টাকা করে দেওয়ার কথা জানানো হয়েছে। এই অর্থ চিকিৎসা ব্যয়, ওষুধ, খাবার, যাতায়াত কিংবা অসুস্থ স্বজনের পাশে থাকতে গিয়ে হারানো আয়ের কারণে সৃষ্ট তাৎক্ষণিক চাপ কিছুটা কমাতে সহায়ক হতে পারে।
বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির সেক্রেটারি জেনারেল কবির এম আশরাফ আলম বলেন, মূল্যায়নের ফলাফল থেকে বোঝা যায়, অনেক পরিবার একই সময়ে স্বাস্থ্য ও আর্থিক—দুই ধরনের সংকটের মুখোমুখি হয়েছে। সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ পরিবারগুলোকে নগদ সহায়তার পাশাপাশি কমিউনিটিতে সচেতনতামূলক কার্যক্রম চালানো হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
বাংলাদেশে আইএফআরসির হেড অব ডেলিগেশন আলবার্তো বোকানেগ্রা বলেন, হামের মতো স্বাস্থ্য জরুরি অবস্থার প্রভাব হাসপাতালের চিকিৎসার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। পরিবারের সদস্যদের দীর্ঘ সময় রোগীর যত্ন নিতে গিয়ে আয় কমে যাওয়া বা কর্মসংস্থান হারানোর মতো সমস্যাও দেখা দিতে পারে। তাই এমন পরিস্থিতিতে চিকিৎসা সহায়তার পাশাপাশি মানবিক সহায়তা ও কার্যকর সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থার প্রয়োজন রয়েছে।
হামের বিস্তার ঠেকাতে টিকাদান কার্যক্রমের পাশাপাশি আক্রান্ত পরিবারগুলোর আর্থিক ঝুঁকি কমানোর বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আইএফআরসি ও অন্যান্য অংশীজনের সহযোগিতায় বাংলাদেশ সরকারের দেশব্যাপী হাম টিকাদান কর্মসূচিতেও বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি সহায়তা করছে। টিকাদান কর্মসূচিকে কার্যকর করতে সচেতনতা বৃদ্ধি, টিকাদান কেন্দ্রে সহযোগিতা এবং সাধারণ মানুষকে টিকা নিতে উৎসাহিত করার কাজে এক হাজারের বেশি রেড ক্রিসেন্ট স্বেচ্ছাসেবক যুক্ত রয়েছেন।
সংশ্লিষ্টদের মতে, একটি শিশুর হাম আক্রান্ত হওয়া কেবল তার চিকিৎসার প্রয়োজন তৈরি করে না; অনেক ক্ষেত্রে এর প্রভাব পুরো পরিবারের অর্থনীতি পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। চিকিৎসা ব্যয়, যাতায়াত, খাবার এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষার খরচের সঙ্গে যুক্ত হয় কর্মদিবস হারানো ও আয় কমে যাওয়ার চাপ। ফলে প্রাদুর্ভাব নিয়ন্ত্রণে টিকাদান ও জনসচেতনতার পাশাপাশি আক্রান্ত পরিবারগুলোর জন্য জরুরি আর্থিক সহায়তা এবং সামাজিক সুরক্ষার ব্যবস্থা জোরদার করা প্রয়োজন। জরিপের ফলাফল সেই বাস্তবতাকেই স্পষ্টভাবে সামনে এনেছে।
মন্তব্য