যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা কার্যকরে সহযোগিতা করলে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর জন্য হরমুজ প্রণালি ব্যবহার সহজ হবে না বলে কঠোর সতর্কবার্তা দিয়েছে ইরান। দেশটির রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা ইরনার বরাতে রোববার এ তথ্য জানিয়েছে আন্তর্জাতিক বার্তা সংস্থা এএফপি। সাম্প্রতিক সময়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা বৃদ্ধির প্রেক্ষাপটে তেহরানের এই অবস্থান আন্তর্জাতিক নৌপরিবহন ও জ্বালানি বাজারে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চলতি বছরের এপ্রিল এবং মে মাসের শুরুতে ইরানের তেল পরিবহন খাত, ড্রোন কর্মসূচি এবং ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উন্নয়ন কার্যক্রমের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ওপর নতুন করে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে যুক্তরাষ্ট্র। একই সঙ্গে হরমুজ প্রণালি অতিক্রমের ক্ষেত্রে তেহরানকে কোনো ধরনের অর্থ বা টোল পরিশোধ না করার জন্য আন্তর্জাতিক জাহাজ চলাচলকারী প্রতিষ্ঠানগুলোকে সতর্ক করে ওয়াশিংটন।
যুক্তরাষ্ট্রের এই পদক্ষেপের জবাবে ইরানের সেনাবাহিনীর কর্মকর্তা মোহাম্মদ আকরামিনিয়া বলেছেন, যেসব দেশ যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমন্বয় করে ইরানের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করবে, তাদের হরমুজ প্রণালি ব্যবহার করতে গিয়ে জটিল পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হতে পারে। তাঁর বক্তব্যে স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে যে, ইরান এ কৌশলগত নৌপথে নিজের নিয়ন্ত্রণ আরও জোরদার করেছে এবং প্রয়োজনে তা ব্যবহার করতে প্রস্তুত।
তিনি জানান, হরমুজ প্রণালিতে নতুন নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা চালু করেছে তেহরান। এসব ব্যবস্থার আওতায় এখন থেকে এই নৌপথ ব্যবহারকারী জাহাজগুলোকে ইরানি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে পূর্বানুমোদন নিতে হবে। ইরানি কর্মকর্তাদের দাবি, জাহাজ চলাচলের অনুমতি প্রদান এবং টোল আদায়ের নতুন প্রক্রিয়া ইতোমধ্যে কার্যকর হয়েছে।
শিপিং বিশ্লেষণধর্মী প্রতিষ্ঠান লয়েডস লিস্ট ইন্টেলিজেন্স জানিয়েছে, এ উদ্দেশ্যে ইরান ‘পার্সিয়ান গালফ স্ট্রেট অথরিটি’ নামে একটি নতুন সংস্থা গঠন করেছে। আন্তর্জাতিক জাহাজ পরিচালনাকারী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কাছে অনুমতির জন্য নির্ধারিত আবেদনপত্রও পাঠানো হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর মাধ্যমে হরমুজ প্রণালিতে প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের একটি নতুন কাঠামো কার্যকর করেছে তেহরান।
শনিবার ইরানের পার্লামেন্টের জাতীয় নিরাপত্তা কমিশনের প্রধান ইব্রাহিম আজিজি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে এক বার্তায় বলেন, যেসব দেশ যুক্তরাষ্ট্র-সমর্থিত অবস্থানের পক্ষে দাঁড়াবে, তাদের জন্য এর পরিণতি সুখকর হবে না। তাঁর এই মন্তব্যও হরমুজ ইস্যুতে ইরানের কঠোর অবস্থানের প্রতিফলন হিসেবে দেখা হচ্ছে।
অন্যদিকে, সম্প্রতি হরমুজ প্রণালিতে ইরানের আরোপিত বিধিনিষেধ প্রত্যাহারের আহ্বান জানিয়ে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে একটি খসড়া প্রস্তাব উত্থাপন করেছে যুক্তরাষ্ট্র ও বাহরাইন। এ পদক্ষেপের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক নৌ চলাচলের স্বাভাবিকতা পুনঃপ্রতিষ্ঠার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
ইরানের পার্লামেন্টের ডেপুটি স্পিকার হামিদরেজা হাজিবাবাই জানিয়েছেন, হরমুজ প্রণালিতে আরোপ করা টোল থেকে প্রথমবারের মতো রাজস্ব আয় করেছে তেহরান। যদিও এই রাজস্বের পরিমাণ সম্পর্কে বিস্তারিত কোনো তথ্য প্রকাশ করা হয়নি।
বর্তমানে সীমিতসংখ্যক জাহাজকে এই নৌপথ ব্যবহারের অনুমতি দিচ্ছে ইরান। বিশ্বের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় হরমুজ প্রণালির গুরুত্ব অত্যন্ত বেশি, কারণ বৈশ্বিক তেল ও গ্যাস পরিবহনের উল্লেখযোগ্য অংশ এই পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে এ নৌপথে যেকোনো বিধিনিষেধ আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে তাৎক্ষণিক প্রভাব ফেলে।
নিচে সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহের একটি সংক্ষিপ্ত চিত্র তুলে ধরা হলো—
| বিষয় | বিবরণ |
|---|---|
| যুক্তরাষ্ট্রের পদক্ষেপ | নতুন নিষেধাজ্ঞা আরোপ ও জাহাজকে অর্থ পরিশোধ না করার সতর্কতা |
| ইরানের জবাব | পূর্বানুমোদন বাধ্যতামূলক ও টোল ব্যবস্থা চালু |
| নতুন সংস্থা | পার্সিয়ান গালফ স্ট্রেট অথরিটি |
| আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া | জাতিসংঘে বিধিনিষেধ প্রত্যাহারের প্রস্তাব |
| বর্তমান অবস্থা | সীমিতসংখ্যক জাহাজ চলাচল করছে |
গত ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার পর থেকে কৌশলগত এই নৌপথে কঠোর নিয়ন্ত্রণ আরোপ করে তেহরান। এর প্রভাবে বিশ্ববাজারে জ্বালানির দাম বৃদ্ধি পেয়েছে এবং আন্তর্জাতিক অর্থনীতিতে নতুন অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। সাম্প্রতিক এই সতর্কবার্তা পরিস্থিতিকে আরও সংবেদনশীল করে তুলেছে।
