বাংলাদেশের বামপন্থী রাজনীতি, গণতান্ত্রিক আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে হায়দার আকবর খান রনো ছিলেন এক ব্যতিক্রমী ব্যক্তিত্ব। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি একই সঙ্গে রাজনীতিবিদ, সংগঠক, তাত্ত্বিক, লেখক ও জননেতার ভূমিকা পালন করেছেন। আদর্শ ও নীতির প্রশ্নে তাঁর অবস্থান ছিল দৃঢ়। ক্ষমতা কিংবা ব্যক্তিগত সুবিধার চেয়ে তিনি মানুষের অধিকার, গণতন্ত্র, অসাম্প্রদায়িকতা, সাম্য এবং শোষণমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার সংগ্রামকে বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন।
১৯৪২ সালের ৩১ আগস্ট এক বনেদি ও অভিজাত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন হায়দার আকবর খান রনো। ছাত্রজীবনেই রাজনীতির প্রতি তাঁর গভীর আগ্রহ তৈরি হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের ছাত্র থাকাকালে তিনি গোপনে কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে যুক্ত হন। ষাটের দশকের শুরুতে পাকিস্তানি শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে যে ছাত্র ও গণআন্দোলন গড়ে উঠছিল, সেখানে তিনি সক্রিয়ভাবে অংশ নেন।
১৯৬২ সালের সামরিক শাসনবিরোধী আন্দোলনে অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে তিনি ছাত্ররাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে শুরু করেন। পরবর্তী সময়ে তিনি পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। সে সময় শিক্ষা, গণতন্ত্র, রাজনৈতিক অধিকার এবং শোষণ-বঞ্চনার বিরুদ্ধে ছাত্রসমাজকে সংগঠিত করার ক্ষেত্রে তাঁর ভূমিকা ছিল উল্লেখযোগ্য।
স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষায় যখন পূর্ব বাংলার মানুষ ক্রমেই ঐক্যবদ্ধ হচ্ছিল, তখনও রনো মানুষের অধিকার ও সামাজিক ন্যায়ের প্রশ্নে সক্রিয় ছিলেন। মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি সংগঠক ও নেতা হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। স্বাধীনতার পরও তাঁর রাজনৈতিক সংগ্রাম থেমে যায়নি। নতুন রাষ্ট্রে গণতন্ত্র, সাম্য ও মানুষের মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তিনি ধারাবাহিকভাবে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালিয়ে যান।
১৯৮২ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত সামরিক স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনেও তিনি সক্রিয় ছিলেন। স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তির আন্দোলন যখন ক্রমশ বিস্তৃত হচ্ছিল, তখন তিনি সংগঠক ও নেতা হিসেবে সেই সংগ্রামে যুক্ত ছিলেন। ১৯৯০ সালের গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে স্বৈরশাসনের পতনের ক্ষেত্রেও তাঁর রাজনৈতিক ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ।
হায়দার আকবর খান রনো বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির পলিটব্যুরোর সদস্য ছিলেন। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি সংগঠনের রাজনৈতিক আদর্শ ও কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তাঁর রাজনীতির কেন্দ্রে ছিল মানুষের অর্থনৈতিক ও সামাজিক মুক্তি, গণতান্ত্রিক অধিকার এবং একটি বৈষম্যহীন সমাজের প্রত্যয়।
রাজনীতির পাশাপাশি জ্ঞানচর্চা ও লেখালেখিতেও তাঁর ছিল বিশেষ আগ্রহ। ইতিহাস, রাজনীতি, দর্শন ও সমাজচিন্তা নিয়ে তিনি নিয়মিত লিখেছেন। তাঁর রচিত ও প্রকাশিত ১৩টি গ্রন্থে রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা, ইতিহাসবোধ এবং সমাজ সম্পর্কে তাঁর চিন্তার প্রতিফলন পাওয়া যায়। তাঁর লেখালেখি বাংলাদেশের মননশীল সাহিত্য ও রাজনৈতিক চিন্তার জগতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান হিসেবে বিবেচিত হয়।
রাজনীতিতে দীর্ঘ সময় সক্রিয় থাকলেও ব্যক্তিজীবনে রনো ছিলেন অত্যন্ত সাদাসিধে ও অনাড়ম্বর। সহকর্মী ও রাজনৈতিক সহযোদ্ধাদের কাছে তিনি ছিলেন বিনয়ী, সদালাপী এবং হাস্যোজ্জ্বল মানুষ হিসেবে পরিচিত। সাধারণ মানুষের সঙ্গেও তাঁর ছিল সহজ ও আন্তরিক যোগাযোগ। রাজনৈতিক মতাদর্শে দৃঢ় অবস্থানের পাশাপাশি ব্যক্তিগত আচরণে তাঁর এই সরলতা তাঁকে অন্যদের থেকে আলাদা করে তুলেছিল।
তাঁর রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, জ্ঞানচর্চা ও সাহিত্যকর্মের স্বীকৃতি হিসেবে ২০২১ সালে তিনি বাংলা একাডেমি পুরস্কারে ভূষিত হন। এই পুরস্কার তাঁর দীর্ঘদিনের সাহিত্য ও মননশীল কর্মকাণ্ডের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতি হিসেবে বিবেচিত হয়।
দীর্ঘ সংগ্রামী রাজনৈতিক জীবনের অবসান ঘটে ২০২৪ সালের ১০ মে। ওই দিন ৮১ বছর বয়সে মারা যান হায়দার আকবর খান রনো। ছাত্ররাজনীতি থেকে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধ, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, গণতন্ত্রের সংগ্রাম এবং বামপন্থী রাজনীতির দীর্ঘ পথচলায় তিনি যে ভূমিকা রেখে গেছেন, তা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
তাঁর জীবন ছিল আদর্শনিষ্ঠ রাজনীতির এক দীর্ঘ উদাহরণ। রাজনৈতিক মত ও পথ নিয়ে বিতর্ক থাকতে পারে, কিন্তু মানুষের অধিকার, গণতন্ত্র এবং সামাজিক ন্যায়ের প্রশ্নে তাঁর দীর্ঘস্থায়ী সক্রিয়তা তাঁকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে স্মরণীয় করে রেখেছে।
আজ তাঁর জন্মদিনে হায়দার আকবর খান রনোকে স্মরণ করা হচ্ছে গভীর শ্রদ্ধায়। তাঁর জীবন ও কর্ম নতুন প্রজন্মের কাছে রাজনৈতিক আদর্শ, জ্ঞানচর্চা এবং জনসম্পৃক্ততার একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে থাকবে। মানুষ চলে যায়, কিন্তু তাঁর কর্ম, চিন্তা ও আদর্শের ছাপ থেকে যায় সমাজে ও ইতিহাসে।









