জিলাইভ বাংলা | সত্যের জয় অবধারিত

পোলাওয়ের চালের কেজি ২৩০, দিশেহারা সাধারণ ক্রেতা

রাজশাহীর বাজারে সুগন্ধি চালের দাম গত কয়েক মাসে অস্বাভাবিকভাবে বেড়েছে। বিশেষ আয়োজন, উৎসব কিংবা অতিথি আপ্যায়নে ব্যবহৃত চিনিগুঁড়া, কালিজিরা ও কাটারিভোগের মতো চাল এখন অনেক পরিবারের জন্য বাড়তি ব্যয়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে চিনিগুঁড়া চালের দাম বৃদ্ধির হার সবচেয়ে বেশি। প্যাকেটজাত চিনিগুঁড়া চাল, যা কয়েক মাস আগেও প্রতি কেজি ১৩৫ থেকে ১৪০ টাকায় পাওয়া যেত, সেটিই এখন বিক্রি হচ্ছে প্রায় ২৩০ টাকায়।

খোলা চিনিগুঁড়া চালের দামও বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে। তিন মাস আগে প্রতি কেজি ১১৫ থেকে ১২০ টাকায় বিক্রি হওয়া এই চালের দাম এখন ১৭০ থেকে ১৮০ টাকা। পাইকারি বাজারে সুগন্ধি চালের দাম বর্তমানে ১৮০ থেকে ২০০ টাকা এবং খুচরা বাজারে প্রায় ২১০ টাকা পর্যন্ত উঠেছে। মান ও প্রতিষ্ঠানভেদে কিছু চালের দাম আরও বেশি।

দেশি কালিজিরা চালের দামও বেড়েছে। আগে প্রতি কেজি ১২০ থেকে ১২৫ টাকা থাকলেও এখন তা প্রায় ১৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। দিনাজপুরের সুগন্ধি কাটারিভোগ চালের দামও প্রতি কেজিতে প্রায় ১৫ টাকা বেড়ে ৯৫ থেকে ১০৫ টাকায় দাঁড়িয়েছে।

ব্যবসায়ীদের একাংশের দাবি, বিদেশে রফতানি বাড়ায় দেশের বাজারে সুগন্ধি চালের সরবরাহ কমেছে। এর সঙ্গে ধানের ঘাটতি, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর আগাম ধান সংগ্রহ করে মজুত করার বিষয়টিও দামের ওপর চাপ তৈরি করেছে। তবে কোন কারণটি কতটা ভূমিকা রাখছে, তা নিয়ে ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্টদের মধ্যে একমত নেই।

রফতানিকে দায়ী করছেন ব্যবসায়ীরা

সুগন্ধি চালের দাম বাড়ার অন্যতম কারণ হিসেবে রফতানির কথা বলছেন রাজশাহীর কয়েকজন ব্যবসায়ী। তাঁদের দাবি, দেশের উৎপাদনের একটি অংশ বিদেশে চলে যাওয়ায় স্থানীয় বাজারে সরবরাহ কমেছে।

সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তিনটি শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠান মোট ১ হাজার ৫৩০ মেট্রিক টন চাল রফতানি করেছে। চিনিগুঁড়া নামে পরিচিত সুগন্ধি চালের বড় একটি অংশ তৈরি হয় ব্রি-৩৪ ধান থেকে।

রাজশাহীর সাহেববাজারের এপি চাউল ভান্ডার-১-এর মালিক অশোক প্রসাদ বলেন, কোরবানির ঈদের পর থেকেই সুগন্ধি চালের দাম বাড়তে শুরু করে। তাঁর দাবি, কয়েকটি জাতের চালের দাম কেজিতে প্রায় ১০০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে এবং এর পেছনে রফতানির প্রভাব রয়েছে।

কাদিরগঞ্জ এলাকার পাইকারি ব্যবসায়ী জসীম উদ্দিনও রফতানির অনুমতিকে মূল্যবৃদ্ধির অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন। তাঁর ভাষ্য, ছয় মাস আগে যে চাল প্রায় ১০০ টাকা কেজিতে বিক্রি হয়েছে, সেটিই এখন প্রায় ২০০ টাকায় পৌঁছেছে।

তবে তাঁর বক্তব্যে আরেকটি বিষয়ও উঠে এসেছে। তিনি জানান, কোম্পানির গুদাম থেকে বর্তমানে প্রায় ২০০ টাকা কেজি দরে চাল কিনতে হচ্ছে। এর সঙ্গে পরিবহন ব্যয় এবং ব্যবসায়িক কমিশন যোগ হওয়ার পর খুচরা পর্যায়ে দাম আরও বাড়ে।

জসীম উদ্দিন আরও জানান, দুই সপ্তাহ আগে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতরের কর্মকর্তারা তাঁর দোকানে গিয়ে চালের দাম নিয়ে জানতে চান। ২০০ টাকা কেজি দরে পোলাওয়ের চাল বিক্রির অভিযোগে তাঁকে ১০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।

তাঁর দাবি, চাল কেনার দামের প্রমাণ হিসেবে বস্তায় থাকা প্রতিষ্ঠানের নম্বর যাচাই করা সম্ভব। রফতানি বন্ধ হলে দাম কিছুটা কমতে পারে বলেও তিনি মনে করেন।

ধানের দামও বেড়েছে

দিনাজপুরের চালের আড়তদার আতিয়ার রহমানের বক্তব্যে ধানের বাজারের চিত্রও পাওয়া যায়। তিনি জানান, ধান ওঠার সময় ৭৫ কেজির এক বস্তা প্রায় ৪ হাজার টাকায় বেচাকেনা হয়েছিল। পরে সেটি ৬ হাজার টাকা এবং বর্তমানে প্রায় সাড়ে ৮ হাজার টাকায় উঠেছে।

তাঁর মতে, স্থানীয়ভাবে ধানের সরবরাহ কমে যাওয়ায় দাম বেড়েছে। রফতানির প্রভাব রয়েছে কি না, সে বিষয়ে তিনি নিশ্চিতভাবে কিছু বলতে পারেননি।

এতে বোঝা যায়, শুধু চালের বাজারেই নয়, এর আগের ধাপ অর্থাৎ ধানের বাজারেও মূল্যবৃদ্ধির চাপ রয়েছে। ধানের দাম বাড়লে স্বাভাবিকভাবেই চাল উৎপাদনের খরচ বাড়ে। তবে কৃষক যে দামে ধান বিক্রি করেন এবং ভোক্তা যে দামে চাল কেনেন, সেই দুই মূল্যের মধ্যে ব্যবধানও তখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

উৎপাদন কমার প্রভাবও রয়েছে

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সুগন্ধি চালের মূল্যবৃদ্ধির পেছনে আবহাওয়াও একটি কারণ হতে পারে। গত মৌসুমে উত্তরাঞ্চলের কিছু এলাকায় তীব্র তাপপ্রবাহ ও অনাবৃষ্টির কারণে সুগন্ধি ধানের কাঙ্ক্ষিত ফলন হয়নি।

সুগন্ধি ধানের উৎপাদন কমে গেলে বাজারে সরবরাহের ওপর চাপ পড়ে। একই সময়ে বড় চালকলগুলো মৌসুমের শুরুতে তুলনামূলক বেশি দামে ধান কিনে মজুত করলে ছোট মিল ও খোলা বাজারে ধানের সরবরাহ আরও সীমিত হতে পারে।

চাল উৎপাদনের খরচও আগের তুলনায় বেড়েছে। সুগন্ধি চাল প্রক্রিয়াজাত করতে মিলিং ও পলিশিংয়ের প্রয়োজন হয়। এর সঙ্গে বিদ্যুৎ বিল, শ্রম, পরিবহন, প্যাকেটজাতকরণসহ বিভিন্ন খরচ যুক্ত থাকে। এসব ব্যয় বাড়লে তার একটি অংশ শেষ পর্যন্ত খুচরা মূল্যে প্রতিফলিত হয়।

দাম বাড়ায় কমেছে ক্রেতার চাহিদা

সুগন্ধি চাল সাধারণত প্রতিদিনের প্রধান খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয় না। তাই এর দাম বাড়লে সাধারণ চালের মতো সরাসরি প্রতিদিনের খাবারের ব্যয়ে প্রভাব পড়ে না। কিন্তু বিয়ে, জন্মদিন, পারিবারিক অনুষ্ঠান, উৎসব কিংবা অতিথি আপ্যায়নে এ চালের ব্যবহার বেশি হওয়ায় মূল্যবৃদ্ধির চাপ সেসব আয়োজনেও পড়ছে।

সাহেববাজারে চাল কিনতে আসা চাকরিজীবী মোহাম্মদ আজাদ বলেন, সুগন্ধি চাল প্রতিদিনের খাবার না হলেও পারিবারিক অনুষ্ঠানের জন্য এখন বেশি পরিমাণে কেনা কঠিন হয়ে পড়েছে। প্যাকেটজাত চিনিগুঁড়া চালের কেজি ২৩০ টাকা হওয়াকে তিনি অস্বাভাবিক ব্যয় হিসেবে দেখছেন।

রাজশাহীর একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে কর্মরত জাহাঙ্গীর আলম খান জানান, পাঁচ মাস পর পোলাওয়ের চাল কিনতে এসে তিনি বড় ধরনের মূল্যবৃদ্ধির মুখে পড়েছেন। আগেরবার যে চাল ১৪০ টাকা কেজিতে কিনেছিলেন, এবার সেটিই কিনেছেন ২৩০ টাকায়।

সাহেববাজারের আরেক ক্রেতা সেলিনা পারভীন মেয়ের জন্মদিন উপলক্ষে চাল কিনতে এসে দাম দেখে হতাশ হন। তাঁর ভাষ্য, আগে যে অর্থে চার কেজি চাল কেনা যেত, এখন একই অর্থে তিন কেজিও পাওয়া কঠিন।

রেস্তোরাঁতেও বাড়ছে খরচ

সুগন্ধি চালের দাম বৃদ্ধির প্রভাব পড়েছে খাবারের ব্যবসায়ও। কুমারপাড়া এলাকার একটি রেস্তোরাঁর মালিক মো. গোলাপ সরদার জানান, ছয় মাস আগে তিনি প্রতি কেজি পোলাওয়ের চাল প্রায় ১৩০ টাকায় কিনতেন। বর্তমানে একই ধরনের চালের জন্য তাঁকে প্রায় ২০০ টাকা দিতে হচ্ছে।

কিন্তু চালের দাম বাড়ার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পোলাওয়ের দাম বাড়ানো সহজ নয়। কারণ দাম বাড়লে ক্রেতার সংখ্যা ও বিক্রির পরিমাণ কমে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।

চাল ব্যবসায়ী রাজিব হোসেনও একই সমস্যার কথা জানিয়েছেন। তাঁর মতে, আগে অনেক ক্রেতা একসঙ্গে ৫ থেকে ১০ কেজি সুগন্ধি চাল কিনতেন। এখন অনেকে প্রয়োজন মেটাতে মাত্র ১ থেকে ২ কেজি করে কিনছেন।

অর্থাৎ মূল্যবৃদ্ধির ফলে শুধু ভোক্তার ব্যয় বাড়ছে না, বাজারে চাহিদাও কমছে। এতে খুচরা ব্যবসায়ীদের বিক্রির ওপরও প্রভাব পড়ছে।

কৃষকের ঘরে পৌঁছেনি বাড়তি দামের সুফল

চালের খুচরা মূল্য বাড়লেও এর সরাসরি সুফল কৃষকেরা পাচ্ছেন না। কারণ বর্তমান বাজারদরের আগেই অনেক কৃষক তাঁদের উৎপাদিত ধান বিক্রি করে দিয়েছেন।

গোদাগাড়ী উপজেলার কেশবপুর এলাকার কৃষক আসফাকুজ্জামান বাবু দুই বিঘা জমিতে সুগন্ধি ধান চাষ করেছিলেন। প্রায় ছয় মাস আগে তিনি তাঁর ধান বিক্রি করে দিয়েছেন। এখন একই ধান হাতে থাকলে বেশি দাম পাওয়া যেত বলে তিনি মনে করেন।

তবে ভবিষ্যতে সুগন্ধি চালের দাম এমন পর্যায়ে থাকলে তিনি এ ধরনের ধানের আবাদ বাড়ানোর কথা ভাবছেন। কৃষকের এই সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ বাজারে দীর্ঘমেয়াদি ভালো দাম থাকলে সুগন্ধি ধানের চাষ বাড়তে পারে এবং ভবিষ্যতে সরবরাহও বাড়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে।

দিনাজপুরে চিনিগুঁড়া ধানের বড় আবাদ

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, দেশের বেশির ভাগ ব্রি-৩৪ বা চিনিগুঁড়া ধান উৎপাদিত হয় দিনাজপুরে। পাশাপাশি ঠাকুরগাঁও ও পঞ্চগড়েও এ ধানের চাষ হয়।

দিনাজপুরে এবার মোট ২ লাখ ৬০ হাজার ৮৬০ হেক্টর জমিতে ধান উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে চিনিগুঁড়া ধানের আবাদ হয়েছে ৯৫ হাজার হেক্টর জমিতে। আগের বছর এই জাতের ধানের আবাদ হয়েছিল ৯৪ হাজার হেক্টর জমিতে।

দিনাজপুর জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপপরিচালক মো. আফজাল হোসেন জানান, চিনিগুঁড়া ধান থেকে তৈরি সুগন্ধি চাল কয়েকটি বড় প্রতিষ্ঠান মোড়কজাত করে বাজারজাত করে। এর মধ্যে স্কয়ার ফুড অ্যান্ড বেভারেজ, ইস্পাহানি অ্যাগ্রো ও প্রাণ অ্যাগ্রোর নাম রয়েছে।

বোচাগঞ্জ উপজেলার জহুরা অটো রাইস মিল স্থানীয়ভাবে সুগন্ধি চাল প্রক্রিয়াজাত ও বিপণন করে। এ ধানকে ঘিরে জেলায় ছোট-বড় প্রায় ২০০টি স্বয়ংক্রিয় চালকল গড়ে উঠেছে।

তবে আফজাল হোসেনের বক্তব্য অনুযায়ী, বর্তমানে চালের যে দাম দেখা যাচ্ছে, তার সঙ্গে কৃষকের পাওয়া ধানের দামের সামঞ্জস্য নেই। অর্থাৎ বাজারে চালের মূল্যবৃদ্ধি হলেও উৎপাদক পর্যায়ে সেই বাড়তি অর্থের পুরোটা পৌঁছাচ্ছে না।

বাজার তদারকিতে জোর দেওয়ার দাবি

সুগন্ধি চালের দাম বাড়ার পেছনে রফতানি কতটা দায়ী, আর ধানের ঘাটতি, উৎপাদন ব্যয়, মজুত ও পরিবহন খরচ কতটা ভূমিকা রাখছে—এ নিয়ে ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্টদের মধ্যে ভিন্ন মত রয়েছে। তবে কয়েক মাসের ব্যবধানে দাম উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি বাজার তদারকির প্রয়োজনীয়তা সামনে এনেছে।

বিশেষ করে কৃষকের কাছ থেকে ধান কেনার মূল্য, মিল পর্যায়ের প্রক্রিয়াজাতকরণ ব্যয়, বড় প্রতিষ্ঠানের মজুত, রফতানির পরিমাণ এবং খুচরা বাজারের বিক্রয়মূল্যের মধ্যে কতটা পার্থক্য তৈরি হচ্ছে, তা পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন।

সুগন্ধি চালের বাজারে স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনতে উৎপাদন ও সরবরাহ পরিস্থিতির পাশাপাশি মূল্য নির্ধারণের প্রতিটি ধাপ নজরদারির আওতায় রাখা জরুরি। এতে একদিকে ভোক্তারা অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি থেকে কিছুটা সুরক্ষা পাবেন, অন্যদিকে কৃষকের ন্যায্য অংশ নিশ্চিত করার পথও তৈরি হতে পারে।

Tags :

সামিউর রহমান রাতুল | সাব-এডিটর । জিলাইভ বাংলা

https://glive24.com/

সর্বশেষ খবর